মক্কা থেকে আন্দালুস
রমজানের মহাকাব্যিক অভিযাত্রা
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাবা শরিফ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র রমজান ইতিহাসগর্ভ এক জাগরণের সময়। এ মাসেই নাজিল হয়েছে ওহি, সংঘটিত হয়েছে বদরের বিজয়, সম্পন্ন হয়েছে মক্কা বিজয়, হিত্তিন ও আইনে জালুতের মতো ঐতিহাসিক রণসংঘর্ষ। রমজান প্রমাণ করে সিয়াম মানুষকে কর্মবিমুখ করে না; বরং তাকওয়া ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে তোলে। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকা এসব ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রোজা দেহকে সংযম শেখালেও ইমানকে করে অদম্য ও বিজয়মুখর। এ মাসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরা হলো-
ওহি নাজিল : নবুয়তের প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) রাসূল (সা.)-এর ওপর ওহি বা ঐশীবাণী নাজিল হওয়া শুরু হয়। এ মাহেন্দ্রক্ষণে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জগৎকে সম্মানিত করার ইচ্ছা পোষণ করেন; তাই তিনি মুহাম্মাদ (সা.)কে তার ঐশী নুরের মিলনস্থল, খোদায়ী হিকমতের আধার এবং তার বাণীর অবতরণস্থল হিসাবে নির্বাচিত করেন। এর মাধ্যমে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে এবং মূর্তি পূজা ছেড়ে অবিনশ্বর আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসার পথ সুগম হয়। ফলে এ ঘটনাটি মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত এবং মানবতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
আজানের প্রবর্তন : হিজরি প্রথম বছরের রমজান মাসে (৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ) নামাজের জন্য আজানের বিধান প্রবর্তিত হয় এবং এর প্রচলন শুরু হয়। সে সময়ে মুমিনদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঠিক সময় জানা কঠিন ছিল, তাই তারা এ বিষয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেন। সেই রাতে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) স্বপ্নে এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যিনি তাকে আজানের শব্দাবলি ও পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছেন। সকালে তিনি নবী করিম (সা.) কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন : ‘ইনশাআল্লাহ, এটি একটি সত্য স্বপ্ন। তুমি বেলালের সঙ্গে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, যেন সে আজান দেয়; কারণ তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে বেশি উচ্চ ও সুমধুর।’ (তিরমিজি-১৮৯)। সেই মুহূর্ত থেকে আজ অবধি বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে নামাজের জন্য আজান ধ্বনিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ : হিজরির দ্বিতীয় সালের ১৭ রমজান (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হজরত রাসূল (সা.)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং আবু জাহেলের নেতৃত্বে মক্কার মুশরিকদের মধ্যে এ যুদ্ধ হয়। মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা কুরাইশদের হাজারেরও বেশি সেনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেন। আবু জাহেলসহ কুরাইশদের অধিকাংশ নেতার নিধন হয় এ যুদ্ধে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, যখন তোমরা ছিলে অত্যন্ত দুর্বল।’ (সূরা আল-ইমরান : ১২৩)।
এ বিজয়ের ফলে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেন, যা কুরাইশদের মনে তাদের প্রতি সমীহ ও ভীতি তৈরি করে। এ যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত গনিমত বা সম্পদ মুসলমানদের সচ্ছলতা আনে এবং ইসলামি পতাকাকে সমুন্নত করে সত্যের বাণীকে আজ অবধি দেদীপ্যমান রাখতে সহায়তা করে।
মক্কা বিজয় : হিজরি অষ্টম সালের রমজান মাসে (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ) ইতিহাস এক অনন্য ঘটনার সাক্ষী হয়। কুরাইশরা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’র শর্ত ভঙ্গ করায় মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের জন্য দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ বাহিনী মক্কায় পৌঁছালে কোনো রক্তপাত বা যুদ্ধ ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শহরটি জয় করে। এ মহান বিজয়ের ফলে মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং মক্কার কুরাইশদের আধিপত্যের অবসান ঘটে। নবী করিম (সা.) ও তার বাহিনীর ক্ষমা ও মহানুভবতা দেখে মক্কাবাসীরা মুগ্ধ হন এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বিন হারব ও তার স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন।
কাদেসিয়া যুদ্ধ : হিজরি ১৫ সালের রমজান মাসে (৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের (রা.) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী সাসানীয় পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এ যুদ্ধে পারস্যের রাজধানী মাদাইনের পথ উন্মুক্ত হয় এবং ইরাক অঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে। এটি রমজানে মুসলিমদের অসাধারণ সাহস ও ইমানের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হজরত আলীর (রা.) শাহাদত : হিজরি ৪০ সালের ২১ রমজান (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ) চতুর্থ খলিফা হজরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) কুফায় ফজরের নামাজের সময় খারিজি ইবনে মুলজামের বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে শাহাদত বরণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা ছিলেন।
আন্দালুস (স্পেন) বিজয় : হিজরি ৯২ সালের রমজান মাসে (৭১১ খ্রিষ্টাব্দ) মুসলমানরা আন্দালুস জয় করে। এরপর সেখানে প্রায় আটশ বছর মুসলিমরা শাসন করে। এ অভিযানের সূচনা হয় যখন মুসা বিন নুসায়ের আন্দালুস বিজয়ের লক্ষ্যে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান। তারা একটি প্রণালি পার হয়ে সেখানে পৌঁছান, যা পরে তারিক বিন জিয়াদের নামানুসারে ‘জিব্রাল্টার প্রণালি’ (জাবাল আল-তারিক) নামে পরিচিতি পায়। উপকূলে পৌঁছানোর পর তারিক বিন জিয়াদ নিজের বাহিনীর সব জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যাতে কারও মনে পিছু হটার চিন্তা না আসে। এরপর তিনি এক তেজোদীপ্ত ভাষণ দেন, যা সৈন্যদের মনোবল তুঙ্গে নিয়ে যায়। ফলে তারা দক্ষিণ আন্দালুসে গথ বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং পর্যায়ক্রমে সেভিল ও টলেডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জয় করে বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের প্রায় পুরো ভূখণ্ডে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
সিন্ধু বিজয় : হিজরি ৯৩ সালের ৬ রমজান মুহাম্মদ বিন কাসিম আল-সাকাফির নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এবং হিন্দু রাজা দাহিরের বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক ‘রাওয়ারের যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। এ ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় রাজকীয় হাতিগুলো অংশ নিয়েছিল এবং টানা পাঁচ দিন যুদ্ধ চলে। অবশেষে রাজা দাহির নিহত হলে সিন্ধু বিজয় সম্পন্ন হয়। এ বিজয়ের মাধ্যমেই মূলত মুসলমানদের জন্য বিশাল এশিয়া মহাদেশের প্রবেশদ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।
সিসিলি বিজয় : হিজরি ২১২ সালের রমজান মাসে (৮২৭-৮২৮ খ্রিষ্টাব্দ) আসাদ ইবনে ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ভূ-মধ্যসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ সিসিলি জয় করে। এ বিজয় মুসলিমদের ইউরোপের দিকে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল এবং সেখানে ইসলামি সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
হালাকু খানের বাগদাদ দখল : হিজরি ৬৫৬ সালের ২১ রমজান কয়েক সপ্তাহব্যাপী অবরোধের পর মঙ্গোল নেতা হালাকু খান আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদে প্রবেশ করেন। তার সেনাবাহিনী সেখানে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়, যার শুরু হয়েছিল আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে হত্যার মাধ্যমে। মঙ্গোলরা সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র ‘বাইতুল হিকমাহ’সহ অসংখ্য লাইব্রেরি ও মসজিদ ধ্বংস করে দেয়, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র।
আইনে জালুত যুদ্ধ : হিজরি ৬৫৮ সালের ১৫ রমজান, শুক্রবার সকালে (৩ সেপ্টেম্বর ১২৬০ খ্রিষ্টাব্দ) ফিলিস্তিনের বিসান ও নাবলুসের মধ্যবর্তী ‘আইনে জালুত’ গ্রামে মুসলিম বাহিনী ও মঙ্গোলদের মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিশরের মামলুক সুলতান কুতুজ এ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি উচ্চকণ্ঠে ‘ওয়া ইসলামাহ!’ (হায় ইসলাম!) বলে আর্তনাদ করে সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন এবং মঙ্গোলদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মঙ্গোলরা প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালিয়ে যায়। এ বিজয়ের ফলে মিশর ও শাম (সিরিয়া অঞ্চল) একত্রিত হয় এবং ইসলাম ও মুসলমানরা মঙ্গোলদের পৈশাচিক বর্বরতা থেকে রক্ষা পায়।
এ ছাড়া পহেলা রমজানে মিশরের ইসলামি বিজয়, প্রসিদ্ধ ইসলামি স্কলার ইবনে সিনার ইন্তেকাল, দ্বিতীয় রমজানে আলজেরিয়া বিজয়, বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধ, ৭ রমজানে আল-আজহার মসজিদের উদ্বোধন, ১২ রমজানে প্রখ্যাত আলেম ইবনে জাওযীর ইন্তেকাল, ১৩ রমজানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনাসহ আরও বহু ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী এ রমজান মাস।
