Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

মহররম ত্যাগের ক্যানভাসে আত্মশুদ্ধির আলো

Icon

রেহানা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মহররম ত্যাগের ক্যানভাসে আত্মশুদ্ধির আলো

শুরু হয়েছে পবিত্র মহররম মাস-হিজরি সনের প্রথম মাস এবং ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। মহররম শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা, সংযম, ন্যায়, ত্যাগ ও মানবিক জাগরণের এক গভীর আহ্বান। কুরআন, হাদিস ও ইসলামি ইতিহাসে এ মাস বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। বর্তমান সময়ে যখন সমাজে সহিংসতা, নৈতিক অবক্ষয়, প্রতারণা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন মহররম আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সত্য, ধৈর্য ও ন্যায়ের পথ কখনো পরাজিত হয় না।

কুরআনের আলোকে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি... এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।’-(সূরা আত-তাওবা : ৩৬)।

তাফসিরকাররা বলেন, সম্মানিত চার মাস হলো-জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এ মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, আত্মসংযম বৃদ্ধি করা এবং ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। মহররমকে হাদিসে ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে, যা এ মাসের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যায়।

রাসূলাল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন-‘রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’-(সহিহ মুসলিম)।

মহররম শুধু ইতিহাস স্মরণের মাস নয়; এটি রোজা, তওবা, ইবাদত ও তাকওয়া অর্জনের বিশেষ সময়। মহররমের ১০ তারিখ ‘ইয়াওমে আশুরা’ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি বর্ণনায় এ দিনের সঙ্গে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত। হজরত মূসা (আ.) ও বনি ইসরাইল এ দিনে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি পান।

পাশাপাশি ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শাহাদতবরণ করেন। কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয়-অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা নয়, বরং সত্যের পথে অবিচল থাকা ইমানের দাবি। ক্ষমতা, লোভ ও জুলুমের বিপরীতে ন্যায়, ধৈর্য ও আদর্শের অবস্থানই কারবালার মূল বার্তা।

মহররম মাস আত্মশুদ্ধি ও নফল ইবাদতের বিশেষ সুযোগ এনে দেয়। ইসলামি শিক্ষার আলোকে এ মাসে করণীয়-

নফল রোজা পালন : বিশেষত ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা সুন্নত। আশুরার রোজা অতীত এক বছরের গুনাহ মাফের আশাব্যঞ্জক আমল হিসাবে বর্ণিত হয়েছে।

তওবা ও ইস্তিগফার : নতুন হিজরি বছর আত্মসমালোচনারও সময়। অতীতের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নতুনভাবে জীবন গড়ার সংকল্প নেওয়া জরুরি।

নফল নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত : পরিবারে কুরআন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, নিয়মিত তিলাওয়াত ও নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এ মাসের অন্যতম আমল।

দান-সদকা ও মানবিক সহায়তা : অসহায়, দরিদ্র, এতিম ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারবালার ত্যাগ আমাদের মানবতার দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।

আত্মসমালোচনা ও চরিত্র গঠন : নিজের আচরণ, ইমান, সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে ভাবার এ এক মূল্যবান সময়।

যা বর্জনীয় : ইসলাম মহররমে অতিরঞ্জন, কুসংস্কার, বিশৃঙ্খলা বা আত্মনির্যাতন সমর্থন করে না। তাই আত্মহানি, বিভেদ সৃষ্টি, কুসংস্কার, অপচয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এসব থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা ইসলাম দিয়েছে।

মহররম পরিবারকেন্দ্রিক মূল্যবোধ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে। পরিবারে সন্তানদের ইসলামি ইতিহাস ও কারবালার শিক্ষা শোনানো, সম্মিলিত কুরআন তিলাওয়াত, নামাজে যত্নবান হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, দরিদ্র মানুষের সহায়তায় সন্তানদের সম্পৃক্ত করা, অপচয় ও অহংকার থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া-এসব উদ্যোগ একটি সুন্দর ও নৈতিক পরিবার গঠনে ভূমিকা রাখে।

কারবালার শিক্ষা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি সময়ে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর প্রেরণা। মহররমকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম, আলেম সমাজ, শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের উচিত-মহররমের প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরা, কুসংস্কার প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি করা, তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা জানানো, কারবালার ত্যাগকে ন্যায়বিচার ও মানবতার আলোকে ব্যাখ্যা করা।

ধর্মীয় আবেগকে বিভেদ নয়, সামাজিক জাগরণ ও নৈতিক পুনর্গঠনের শক্তিতে রূপান্তর করাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি। মহররম আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য ও ন্যায় চিরন্তন। এ মাস শুধু স্মৃতিচারণের নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ইমানি দৃঢ়তা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার মাস। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি, সংযম, ন্যায় ও আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠিত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম