Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

ইতিহাসের অলৌকিক প্রদীপ

বিশ্বনবীর অনুকরণীয় জীবনালেখ্য

Icon

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বনবীর অনুকরণীয় জীবনালেখ্য

রাসূলুল্লাহ (সা.) এমনই এক নিখুঁত, সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব, যার মানবীয় চরিত্র ও জীবনদর্শন মহাবিশ্বের প্রতিটি অংশ এবং মানবজীবনের প্রতিটি দিককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ইবাদত, লেনদেন, নৈতিকতা, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক কিংবা পারিবারিক জীবন-সবক্ষেত্রেই তার ব্যক্তিসত্তা এক অনুপম ও নিখুঁত উদাহরণ। নবুয়তের আগে তিনি ছিলেন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার ধারক ‘আল-আমিন’, আর নবুয়তের পর একাধারে মহান দায়ী, মদিনা রাষ্ট্রের সফল রাষ্ট্রপ্রধান, বিচক্ষণ বিচারক, প্রজ্ঞাবান সেনাপতি ও মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মহান আল্লাহতায়ালা তাই তাকে কিয়ামত অবধি উম্মাহর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে উপস্থাপন করে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে।’ (সূরা আল-আহজাব : ২১)।

সিরাতে নববীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সন্দেহাতীত ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতা। ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট ও উজ্জ্বল আলোকে এটি সংরক্ষিত হয়েছে। অন্যান্য ধর্মের নবী-রাসূল বা ধর্মপ্রবর্তকদের জীবনীকালের আবর্তে বিকৃত বা রহস্যাবৃত হলেও, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পুরো জীবনী একেবারে শতভাগ অবিকৃত ও অবিচ্ছিন্ন সনদে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। হজরত মুসা (আ.) বা হজরত ঈসা (আ.)-এর জীবনের ধারাবাহিক ইতিহাস আজ যেভাবে তাওরাত বা ইনজিলের বিকৃতির কারণে ধোঁয়াশাপূর্ণ, বিশ্বনবীর জীবনের ক্ষেত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

রাসূল (সা.)-এর বাবা-মায়ের বিবাহ, তাঁর শুভ জন্ম, শৈশব, যৌবন, নবুয়তপূর্ব ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রাত্যহিক জীবনের আচার-আচরণ, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক, চালচলন, পারিবারিক মিথস্ক্রিয়া থেকে শুরু করে তাঁর মাথার বরকতময় পাকা চুলের সংখ্যা পর্যন্ত বর্ণনাকারীরা অতি বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন। বিখ্যাত ফরাসি চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনান স্বীকার করেছেন, ‘অন্যান্য ধর্ম যেমন রহস্যাবৃত দোলনায় লালিত হয়েছিল, ইসলামের ব্যাপার সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামের অভ্যুদয় হয়েছে ইতিহাসের পরিপূর্ণ আলোকে।’

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাত কোনো কাল্পনিক উপাখ্যান বা মানুষের সাধ্যের বাইরের অলৌকিক ঘটনাপ্রবাহ নয়; বরং এটি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের বাস্তব চর্চা ও অভিজ্ঞতার ইতিহাস। তিনি যা শিক্ষা দিয়েছেন, নিজ কর্মের মাধ্যমে তা প্রথমে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি অপবাদ ও অত্যাচার সহ্য করেছেন, ক্ষুধা সয়েছেন, মাতৃভূমি ত্যাগ করে হিজরত করেছেন এবং বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিরাত আমাদের দেখায় যে, ইসলাম তরবারির জোরে নয়, বরং প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াত, ব্যবহারিক চরিত্র ও আদর্শিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে সমগ্র আরবে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সিরাতের একটি বিশেষ দিক হলো, মহানবী (সা.) মানুষকে অলৌকিক জাদুকরী ঘটনার মাধ্যমে প্রভাবিত না করে, মানুষের বিচারবুদ্ধি ও অনুভূতির বিবেককে নাড়া দিয়েছেন। কুরাইশরা যখন নানা অবাস্তব মোজেজা দেখানোর দাবি জানিয়েছিল, তখন পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, নবী তো শুধু একজন মানুষ ও পথপ্রদর্শক (সূরা বনি ইসরাইল : ৯০-৯৩)। ইসলামের সবচেয়ে বড় মুজিজা হলো ‘আল-কুরআন’, যা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিরন্তন সত্যের স্মারক (সূরা আনকাবুত : ৫০-৫১)। মানুষের বিবেক ও হৃদয়কে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত করাই ছিল সিরাতের মূল ধারা।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি জীবনের একটি বা দুটি ক্ষেত্রে সফল হয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র মুহাম্মাদ (সা.)-এর সিরাতেই জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিখুঁত আদর্শের সুষম সমাবেশ ঘটেছে। তিনি একাধারে আদর্শ যুবক, অনুকরণীয় স্বামী, স্নেহশীল পিতা, সত্যবাদী ব্যবসায়ী, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, প্রজ্ঞাবান সেনাপতি, ইনসাফগার বিচারক ও আত্মিক অভিভাবক। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর ও পেশার মানুষের জন্য তার জীবনে রয়েছে শাশ্বত দিকনির্দেশনা।

বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ চরম সংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সিরাত চর্চার অভাব ও অসচেতনতার কারণে আজ আমাদের সমাজ থেকে নৈতিকতা ও নববী চরিত্র অন্তর্হিত হতে বসেছে। এ সুযোগে ইসলামবিরোধী শক্তি ও প্রাচ্যবিদরা সিরাত সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা করছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .