এআইয়ের যুগে ইমান ও নৈতিকতার চ্যালেঞ্জ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক মোড় ঘুরানো অধ্যায়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি। চাকা আবিষ্কার কিংবা শিল্প বিপ্লব মানবজাতিকে যতটুকু না বদলে দিয়েছিল, তার চেয়েও দ্রুত ও গভীর রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (এআই)। আজ ছবি আঁকা থেকে শুরু করে প্রবন্ধ লেখা, জটিল সমস্যার সমাধান, কিংবা মানুষের আবেগ অনুধাবনের চেষ্টা-সবকিছুই করছে অ্যালগরিদম ও ডেটাচালিত এআই প্রযুক্তি। এআই মানবজীবনের কাজের গতি বাড়াচ্ছে, চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলছে, গবেষণায় আনছে সাফল্য। তবে এ বিশাল সুবিধার আড়ালে বিশ্বজুড়ে মুমিন বান্দা ও বিবেকবান মানুষের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে একটি বড় প্রশ্ন-প্রযুক্তির এ তুঙ্গস্পর্শী যুগে আমাদের ইমান ও নৈতিকতার অবস্থান কোথায়?
ইসলামি জীবনদর্শনের মূল কথাই হলো তাওহিদ বা একত্ববাদ এবং মানুষের ‘আমানতদারিতা’। আল্লাহতায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে নিজের ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি হিসাবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দান করেছেন আকল বা বিবেক-বুদ্ধি। প্রযুক্তি মানুষেরই তৈরি একটি হাতিয়ার। কিন্তু যখন সেই হাতিয়ার মানুষের নিজস্ব চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ ও সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীলতাকে ধোঁকা দেয় বা স্থানচ্যুত করতে চায়, তখনই তৈরি হয় ইমানি সংকট।
ইমানের ওপর প্রযুক্তির সূক্ষ্ম প্রভাব
এআই যুগের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো মানুষের আত্মিক ও ইমানি চেতনায় অনীহা চলে আসা। আজ যে কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য মানুষ আল-কুরআন বা সুন্নাহর গভীর অধ্যয়ন কিংবা প্রাজ্ঞ আলেমদের দ্বারস্থ না হয়ে ঝুঁকছে চ্যাটবটের দিকে। মানুষের মনে একটি সূক্ষ্ম ধারণার জন্ম হচ্ছে-প্রযুক্তিই বোধহয় সর্বজ্ঞ (নাউযুবিল্লাহ)। অথচ সর্বজ্ঞতা শুধু মহান আল্লাহতায়ালারই গুণ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন- ‘তিনিই অদৃশ্য ও দৃশ্যমান সব বিষয়ের বিষয়ে পরিজ্ঞাত, তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।’ (সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত : ৬)।
প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত অন্ধবিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করা থেকে বিচ্যুত করতে পারে। এআই যখন মানুষের ভবিষ্যৎ ভাগ্য, ক্যারিয়ার বা সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ফল ভবিষ্যদ্বাণী করতে শুরু করে, তখন অনিচ্ছাকৃতভাবেই মানুষের মনে ‘গাইব’ বা অদৃশ্যের জ্ঞানের ওপর যে ইমান থাকা আবশ্যক, তাতে ফাটল ধরার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নৈতিকতার সংকট
ইসলামিক নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘সত্যবাদিতা’ এবং ‘গিবত বা অপবাদ থেকে দূরে থাকা’। কিন্তু এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার আজ সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী দেওয়ালটিকে একবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
ডিপফেক ও মিথ্যা তথ্য : ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে যে কোনো মানুষের চেহারা ও কণ্ঠ নকল করে অবিকল ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এটি ব্যবহার করে একজন নিরপরাধ মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় করা, ভুয়া সংবাদ ছড়ানো কিংবা চরিত্রহনন করা অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই-বাছাই ছাড়া) তা-ই বর্ণনা করে।’ (সহিহ মুসলিম)। যাচাই ছাড়া এআই তৈরি কনটেন্ট শেয়ার করা বা ছড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে ঘোর পাপ।
প্রতারণা ও মেধা চুরি : ছাত্র থেকে শুরু করে গবেষক-অনেকেই আজ এআই দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নিচ্ছেন এবং অন্যের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। ইসলামে প্রতারণা, ফাঁকি ও আমানতের খেয়ানতকে কঠোরভাবে হারাম করা হয়েছে। রাসূল (সা.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন : ‘যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)।
মানবিক সম্পর্ক বিনাশের শঙ্কা
ইসলাম সামাজিক বন্ধন, এতিম-মিসকিনের হক আদায় এবং নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) রক্ষা করাকে ইমানের অংশ করেছে; কিন্তু এআইচালিত ভার্চুয়াল জগৎ মানুষকে বাস্তব জীবনের আত্মিক বন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ এখন রক্ত-মাংসের চেয়ে স্ক্রিনের এআই সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
এর ফলে মানুষের সহানুভূতি, দয়া-মায়া ও পরোপকারের মতো মানবিক গুণাবলি লোপ পাচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলছে, যা ইসলামি সামাজিক ব্যবস্থার পুরোপুরি পরিপন্থি।
মুমিনের করণীয় ও ইমানি দায়িত্ব
এআই বা আধুনিক প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ভালো’ বা ‘বাজে’ নয়। এর ভালো বা মন্দ রূপ নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের নিয়তের ওপর। তাই এআইয়ের এ বিপ্লবের যুগে একজন ইমানদার হিসাবে আমাদের কিছু মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে-
‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি বজায় রাখা : এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্তরে আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া থাকতে হবে। আমি যখন একান্তে কোনো ডিভাইসে এআই ব্যবহার করছি, তখন মনে রাখতে হবে, মানুষ না দেখলেও আল্লাহতায়ালা আমাকে দেখছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে : ‘তিনি চোখের খিয়ানত এবং অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কেও পূর্ণ অবহিত।’ (সূরা গাফির, আয়াত : ১৯)।
ইসলামি নীতি মেনে চলা : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি চোখ ধাঁধানো যে কোনো পোস্ট, অডিও বা ভিডিও দেখলেই তা বিশ্বাস বা শেয়ার করা যাবে না। আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন : ‘হে ইমানদারগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো বার্তা নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে...’ (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত : ৬)।
হালাল ও নৈতিক ব্যবহার : এআইকে শিক্ষা, গবেষণা, দাওয়াতের কাজ এবং মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। সৃজনশীল কাজ সহজ করতে এআইয়ের সহায়তা নেওয়া দোষের নয়, কিন্তু জালিয়াতি, নকল বা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া থেকে শতভাগ দূরে থাকতে হবে।
আলেমদের দিকনির্দেশনা : ধর্মীয় বিষয়ে জানার জন্য প্রযুক্তির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল না হয়ে সহিহ ইলম হাসিল করতে হবে অভিজ্ঞ আলেম-ওলামাদের কাছ থেকে। কারণ প্রযুক্তির ভেতরে ‘রুহ’ বা ‘তাকওয়া’ নেই, যা শুধু একজন সালেহ আলেমের সাহচর্যেই পাওয়া যায়।
প্রযুক্তির অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় এবং ইসলাম বিজ্ঞানের এ উন্নয়নকে স্বাগত জানায়, যতক্ষণ না তা মানবতার জন্য ক্ষতিকর হয়। তবে মনে রাখতে হবে, যন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তা মানুষের বিবেকের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন আমাদের মানবীয় বুদ্ধিমত্তা ও হৃদয়কে গ্রাস করতে না পারে-সে বিষয়ে প্রতিটি মুমিনকে সতর্ক থাকতে হবে।
আসুন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ইমানের আলোয় পরিচালিত করি। প্রযুক্তিকে দাস বানিয়ে নিজের ইমানকে মনিব করে রাখি। তবেই প্রযুক্তি হবে আমাদের জন্য নেয়ামত, আখিরাতে নাজাতের ওসিলা এবং এক নৈতিক ও সুন্দর পৃথিবী গড়ার হাতিয়ার। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে এ ফিতনাময় যুগে ইমান ও নৈতিকতার ওপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সহসম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

