শিক্ষায় শারীরিক শাস্তি, ইসলাম কী বলে?
আমিনুল ইসলাম হুসাইনী
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদ্রাসা ও স্কুলের কিছু শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেসব ভিডিওতে দেখা যায় শিক্ষকরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শাসনের নামে বেদম প্রহার করছে। অথচ ইসলামে শিশুদের ওপর বেদম প্রহার বা শারীরিক নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষেধ। ইসলাম কোমলতা, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে শিক্ষাদানের নির্দেশ দেয়। যেখানে মহান আল্লাহ ১০ বছর হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুদের নামাজ বা অন্য কোনো বিধান পালনেও প্রহার করতে নিষেধ করেছেন, সেখানে সামান্য দুষ্টুমি, পড়ায় একটু অমনোযোগী হলেই শিক্ষক কী করে এমন নির্মম প্রহার করতে পারেন? এটা তো স্পষ্টত জুলুম। শিক্ষক কি জালেম হতে পারে?
শিক্ষক মানে পথপ্রদর্শক। সংশোধনকারী। তাই শাসন যেন জুলুম না হয়।
শিক্ষক হবেন একজন দরদী মালি। মালি যেমন দিন-রাত পরিশ্রম করে বাগানে ফুল ফোটান। গাছের গোড়ায় পানি ঢেলে, মাটি দিয়ে তাদের জীবন বাঁচান। সুন্দর ও সতেজ করেন। তেমনি একজন শিক্ষকও কোমলমতি শিশুদের সুন্দর আগামী নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এ জন্যই ইসলাম শিক্ষককে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন করো এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শেখ। এবং যার কাছ থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর। তাকে সম্মান কর।’ (আল মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৬১৮৪)।
এ সম্মান তখনই অর্জিত হবে, যখন প্রকৃত শিক্ষক নিজের মাঝে শিক্ষকের গুণাবলি ধারণ করতে পারবে।
শিক্ষককে বুঝতে হবে, তিনি একটি মহৎ পেশা ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এটি স্বয়ং আল্লাহতায়ালার সিফাত। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রাহমানের শুরুতেই এ প্রসঙ্গটি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর রাহমান। আল্লামাল কুরআন।’ অর্থাৎ ‘তিনি করুণাময় (আল্লাহ)। কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।’
বর্ণিত আয়াতে দুটি দিক স্পষ্ট হয়। প্রথমত, আল্লাহতায়ালাই প্রথম শিক্ষক। দ্বিতীয়ত, তিনি রাহমান। মানে দয়াশীল। সুতরাং শিক্ষক হতে হলে এই গুণে গুণান্বিত হতে হবে। দয়াবান হতে হবে।
শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য কখনো বাবা। কখনো মা। আবার কখনো খেলার সাথি।
বাবার মতো দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগামী নির্মাণ করবেন। মায়ের মমতায় তাদের কাছে রাখবেন। এবং খেলার সাথি হয়ে শিক্ষার্থীর আপন হয়ে ওঠবেন। যেন শিক্ষার্থী তার কাছে সবকিছু খুলে বলতে পারে।
শিক্ষকের উচিত পাঠদানের পর শিক্ষার্থীদের চেহারার দিকে তাকানো। এবং চেহারা দেখে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করা। পড়া শেষে যদি তাদের চেহারায় আনন্দের আভা দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে তারা আপনার পড়ানো বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছে। আর যদি তাদের চেহারায় নৈরাশ্যের ছাপ ভেসে ওঠে। তাহলে বুঝে নেবেন, তারা আপনার পড়ানো বিষয়টি ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি। তখন শিক্ষকের উচিত পরে ওই বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া।
শিক্ষার্থীরা আমানত। তাদের সন্তানের মতো স্নেহ করতে হয়। আল্লাহতায়ালার পরে নবীজি (সা.) পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি বলেছেন, ‘সন্তানের জন্য পিতা যেমন, আমিও তোমাদের জন্য তেমন।’ (সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ৪০)।
শিক্ষার্থী যদি কোনো ভুল করে, তাহলে অভিমান করার অভিনয় করুন। আপনি তাকে বোঝান, সে যে কাজটি করেছে, তা ঠিক নয়। এবং এ জন্য আপনি তার সঙ্গে অভিমান করেছেন।
এতে শিক্ষার্থী নিজের ভুল বুঝতে পারবে। এবং আপনার প্রতি আরও মনোযোগী হবে।
রাগের বশে কখনোই বেত্রাঘাত করা যাবে না। এতে হিতে বিপরীত হবে। শরীরে দাগ পড়ে যাবে। হাড্ডিতেও আঘাত লাগতে পারে। তা ছাড়া এ আচরণের কারণে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হয়। নিজের সম্মান নষ্ট হয়।
মৌখিক শাসনের বেলায়ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কখনো শিক্ষার্থীকে কুকুর, বিড়াল, শূকর, গাধা, গরু, ছাগল, ইত্যাদি শব্দে শাসাবেন না। তাদের বকাঝকার পরিবর্তে বেশি বেশি দোয়া করুন। মনে রাখবেন, শিক্ষকতার পেশাটি শুধু বেতন-ভাতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এখানে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির বিষয়টিই মুখ্য। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে এবং মানুষকে শিক্ষা দান করে; আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বে তাকেই মহান বলা হয়। সে সূর্যের মতো অপরকে আলো দান করে এবং নিজেও আলোকময়। সে মেশকের মতো অপরকে সুগন্ধিতে আমোদিত করে এবং নিজেও সুগন্ধি যুক্ত।’
লেখক : প্রাবন্ধিক, ইমাম ও খতিব, কালিয়ারা জামে মসজিদ। কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
