Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

হজরত রাসূল (সা.)-এর ওফাতের প্রকৃত তারিখ কোনটি?

Icon

ইমাম সৈয়দ এ. এফ. এম. মঞ্জুর-এ-খোদা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত রাসূল (সা.)-এর ওফাতের প্রকৃত তারিখ কোনটি?

সংগৃহীত ছবি

ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মাঝে আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র ওফাত (ইন্তেকাল) দিবস নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার শেষ নেই। এ বিষয়ে ইতিহাসবিদরা নিজস্ব গবেষণা ও দলিলের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন মতপ্রকাশ করেছেন। আসুন তবে দেখে নেওয়া যাক, প্রচলিত মতগুলো কী কী-

প্রথম মত : ১২ রবিউল আউয়াল

আমাদের সমাজে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর ওফাত দিবস হিসাবে ১২ রবিউল আউয়াল তারিখটিই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। ঐতিহাসিক আল-ওয়াকিদি, ইবনে সাদ এবং পরবর্তীকালের সিরাত গবেষক আল-সাল্লাবী, আল্লামা শফিউর রহমান মুবারকপুরী ও মাওলানা ইদরিস কান্ধলভী প্রমুখ তাদের গ্রন্থে এ তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয় মত : ১ রবিউল আউয়াল

সিরাত গবেষণার আরেক প্রামাণ্য ধারায় ১ রবিউল আউয়ালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। প্রাচীন সিরাত লেখক মুসা ইবনে উকবা, বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম লাইস মিছরী ও আল-খাওয়ারিজমীসহ আরও অনেক ঐতিহাসিকের মতে, আল্লাহর রাসূল (সা.) ১ রবিউল আউয়াল তারিখে ওফাত লাভ করেছিলেন।

তৃতীয় মত : ২ রবিউল আউয়াল

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হিশাম ইবনে মোহাম্মদ কালবী এবং স্বনামধন্য হাদিস সংকলক ইমাম বায়হাকীর মতো বিশিষ্ট গবেষকরা তাদের সংকলনে ২ রবিউল আউয়ালের পক্ষে বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন।

মূলত, সব ঐতিহাসিক, সিরাত বিশেষজ্ঞ ও ইসলামি গবেষকই চুলচেরা যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আল্লাহর প্রিয় হাবিব হজরত রাসূল (সা.)-এর ওফাতের তারিখ নিয়ে বিতর্কের শেষ হয়নি। এমতাবস্থায় বরেণ্য ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক, মুফাসসিরে কুরআন ও জগৎবিখ্যাত সুফি সাধক হজরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা (রহ.) পবিত্র কুরআন, হাদিস শরিফ, তাফসির শরিফ, সিরাত ও ইসলামি জ্যোতির্বিদ্যার ওপর নিরলস গবেষণা চালিয়ে এ দীর্ঘদিনের মতভেদের এক ঐতিহাসিক অবসান ঘটিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাণিতিক সমীকরণ অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর ওফাতের প্রকৃত তারিখ উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আসুন তবে দেখে নেওয়া যাক তার সেই কালজয়ী ও প্রামাণ্য গবেষণাটি, যা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর ওফাতের প্রকৃত তারিখ স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে তুলে ধরেছে-

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন-

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম।’ (সূরা আল মায়িদাহ আয়াত : ৩)।

এ আয়াত নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও রইসুল মুফাসসেরিন (শ্রেষ্ঠ তাফসিরকার) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-

‘এ আয়াত দশম হিজরির ৯ জিলহজ তারিখে (বিদায় হজের দিন) নাজিল হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) মাত্র একাশি দিন পৃথিবীতে জীবিত ছিলেন।’ (ই. ফা. বা. কর্তৃক অনূদিত তাফসিরে মা’আরিফুল কুরআন, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা ৩০)।

একই প্রসঙ্গে তাফসিরে দুররে মানসুরে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে জারীর কর্তৃক ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণিত-

‘এই আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা.) একাশি রাত দুনিয়াতে অবস্থান করেন।’ (৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০)।

তাফসিরে তাবারিতে বর্ণিত হয়েছে, হাজ্জাজ কর্তৃক ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণিত-

‘এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর ৮১ রাত রাসূলুল্লাহ্ (সা.) জীবিত ছিলেন।’ (৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮০)।

তাফসিরে মাজহারিতে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম বাগভী (রহ.) হারুন ইবনে আনতারা ও তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন-

‘এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।’ (৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫)।

তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে জারীর ও অন্যান্য মুফাসসিরের মতে-

‘আরাফাহ দিবসের (৯ জিলহজ) পর হজরত রাসূল (সা.) ৮১ দিন জীবিত ছিলেন।’ (২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩)।

গাণিতিক পঞ্জিকা ও দিন-তারিখের সমন্বয়

এ কথা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ও প্রমাণিত যে, আরাফার ময়দানে যে দিন এই পবিত্র আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল, সেদিনটি ছিল ১০ম হিজরির ৯ জিলহজ, বিদায় হজের দিন। আর শুক্রবার জুমার দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই হজকে ইতিহাসে ‘আকবরি হজ’ও বলা হয়। সুতরাং ১০ম হিজরির ৯ জিলহজ শুক্রবারকে ভিত্তি ধরে হিসাব করলে হজরত রাসূল (সা.)-এর ওফাতের সঠিক তারিখ সহজেই উন্মোচিত হয়। হজরত ওমর (রা.) কর্তৃক প্রণীত ‘আট বছর চক্রের চান্দ্র পঞ্জিকা’ (Eight Year Cyclic Lunar Calendar) অনুযায়ী জিলহজ মাস ২৯ দিন, মহররম মাস ৩০ দিন এবং সফর মাস ২৯ দিন ধরলে হিসাবটি দাঁড়ায়-

জিলহজ মাসের বাকি ২১ দিন + মহররম মাসের ৩০ দিন + সফর মাসের ২৯ দিন + রবিউল আউয়াল মাসের ১ দিন = সর্বমোট ৮১ দিন। সুতরাং এ হিসাবে হজরত রাসূল (সা.) একাদশ হিজরির ১ রবিউল আউয়াল সোমবার ওফাত লাভ করেছিলেন।

‘আখেরি চাহার সোম্বা’ থেকে ওফাতের তারিখ নির্ণয়

রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, জীবনের শেষভাগে তিনি কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। তবে ওফাতের ঠিক ৫ দিন আগে, সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি হঠাৎ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং গোসল করে মসজিদে নববীতে উপস্থিত হন। এ ঘটনাটির পর রাসূল (সা.) তাঁর পার্থিব জীবনে আর কোনো বুধবার পাননি। তাই এ ঐতিহাসিক দিনটিকে মুসলিম বিশ্বে আজও ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বা ‘হজরত রাসূল (সা.)-এর জীবনের শেষ বুধবার’ হিসাবে স্মরণ করা হয়। আর হজরত উমর ফারুক (রা.) প্রণীত আট বছর চক্রের চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী ২৫ সফরের ৫ দিন পর কোনোভাবেই ১২ রবিউল আউয়াল হয় না, হয় ১ রবিউল আউয়াল।

সুতরাং, পবিত্র কুরআনের অখণ্ডনীয় তাফসিরগুলো, হজরত উমর (রা.) কর্তৃক প্রণীত ‘আট বছর চক্রের চান্দ্র পঞ্জিকা’-এর নির্ভুল গাণিতিক হিসাব এবং আখেরি চাহার সোম্বার পর্যালোচনা-এ সবকটি ঐতিহাসিক সূত্র একই বিন্দুতে মিলিত হয়ে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ১১ হিজরির ১ রবিউল আউয়াল, সোমবারই ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র ওফাত দিবস।

পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে এ ফরিয়াদ-আমরা যেন উপরিউক্ত গবেষণামূলক আলোচনা থেকে তাঁর প্রিয় হাবিব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের সঠিক তারিখ অনুধাবন করতে পারি এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে যথাযথ মর্যাদায় দিনটিকে স্মরণ করতে পারি। একইসঙ্গে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর কদম মোবারকে জানাই শত কোটি সালাম ও কদমবুসি। আমিন।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .