ইমাম-মুয়াজ্জিনের আত্মনির্ভরতার পথ
ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই একজন মানুষ আমাদের ঘুম ভাঙান, আজানের সুমধুর ধ্বনি তুলে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সময়মতো দাঁড়ান, মানুষকে নামাজ পড়ান, জানাজা পড়ান, শিশুদের কুরআন শেখান। অথচ সেই মানুষটি, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন কিংবা খাদেম, অনেক সময় নিজের সংসারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খান।
মাস শেষে যে সামান্য সম্মানি তার হাতে আসে, তা দিয়ে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একটি পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। আমরা যারা তাদের কাছে আত্মার খাদ্য গ্রহণ করি, তারা কি কখনো ভেবে দেখি, এ মানুষগুলো নিজেদের ও পরিবারের খাদ্যের জোগান দেন কীভাবে?
ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা শুধু নামাজ পড়ান না; তারা মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, জানাজা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের দায়িত্বশীল, শিশুদের কুরআন শিক্ষার শিক্ষক এবং সমাজের নৈতিক নেতৃত্বের অংশ। অথচ অনেক মসজিদে তাদের সম্মানি জীবনযাপনের ন্যূনতম প্রয়োজনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দ্রব্যমূল্য বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্মানি বছরের পর বছর অপরিবর্তিত থাকে। নেই যথেষ্ট চিকিৎসা সহায়তা, উৎসব ভাতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। তারপরও তারা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
শুধু সম্মান নয়, প্রয়োজন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়; আমাদের সামাজিক মনোভাবও এর সঙ্গে জড়িত। আমরা ইমাম-মুয়াজ্জিনের দায়িত্বকে পবিত্র মনে করলেও তাদের জীবনযাপনের বাস্তব প্রয়োজনকে অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। যেন দ্বীনের খেদমত করলে তাদের নিজের কোনো আর্থিক প্রয়োজন থাকতে নেই! এ ধারণা বদলাতে হবে। দ্বীনের খেদমত অবশ্যই মহৎ দায়িত্ব। কিন্তু একজন ইমাম বা আলেমেরও পরিবার আছে, সন্তান আছে, চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। তাই তার সম্মানি এমন হওয়া উচিত, যাতে তিনি আত্মমর্যাদা বজায় রেখে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
দ্বীন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য
ইসলাম হালাল উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং শ্রম ও বৈধ জীবিকা অর্জনকে মর্যাদা দিয়েছে। মহানবী (সা.) নবুয়তের আগে ব্যবসা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও দ্বীনি দায়িত্বের পাশাপাশি হালাল জীবিকা অর্জনের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
হজরত আবু বকর (রা.) ব্যবসা করতেন, হজরত উসমান (রা.) ছিলেন সফল ব্যবসায়ী এবং হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মদিনায় এসে নতুন করে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তিনি আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে বলেছিলেন, ‘আমাকে বাজারের পথ দেখিয়ে দাও।’ এরপর ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হন। তারা সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য বানাননি; বরং হালাল সম্পদকে দ্বীন, পরিবার ও মানবকল্যাণে ব্যয় করেছেন।
তাই ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মধ্যেও আত্মনির্ভরতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। কেউ ব্যবসা, কৃষিকাজ, লেখালেখি, অনলাইন শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর বৈধ কাজ কিংবা অন্য কোনো হালাল পেশায় যুক্ত হতে পারেন। এতে তাদের মর্যাদা কমবে না; বরং দ্বীনের খেদমত ও হালাল জীবিকার একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি হবে।
তবে আত্মনির্ভরতার অর্থ এই নয় যে, অপ্রতুল সম্মানিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করাও সমাজের দায়িত্ব।
মসজিদ কমিটির দায়িত্ব
মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। একজন ইমাম নিয়োগ দিয়ে এমন সম্মানি দেওয়া উচিত নয়, যাতে তাকে সংসার চালাতে অন্যের কাছে হাত পাততে হয়। মসজিদের আয় ও সামর্থ্য অনুযায়ী ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের দায়িত্ব, যোগ্যতা ও প্রয়োজন বিবেচনায় সম্মানি নির্ধারণ করা উচিত।
ইমামকে শুধু নামাজ পড়ানোর মানুষ হিসাবে দেখলে চলবে না। তিনি একটি মহল্লার ধর্মীয় ও নৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তাই তার মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্রেরও ভূমিকা রয়েছে। তাদের জন্য কার্যকর নীতিমালা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে তারা আরও প্রশান্তি ও মনোযোগের সঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সবচেয়ে আগে বদলাতে হবে আমাদের মানসিকতা। ‘হুজুর মানেই গরিব’ কিংবা ‘আলেম মানেই অন্যের দানে চলবেন’, এ ধারণা ইসলামের সামগ্রিক জীবনদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমরা এমন আলেম সমাজ চাই, যারা ইলমে সমৃদ্ধ, আমলে আদর্শ, চরিত্রে অনুকরণীয় এবং অর্থনৈতিকভাবেও আত্মমর্যাদাশীল। দ্বীনের খেদমত দারিদ্র্যের সমার্থক নয়। হালাল উপার্জন একজন মুসলমানকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে এবং অন্যের উপকার করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
আসুন, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে ইমাম-মুয়াজ্জিনরা সম্মানের সঙ্গে দ্বীনের খেদমত করবেন এবং পাশাপাশি হালাল উপার্জনের মাধ্যমে নিজেদের ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন। আলেম সমাজ হবে আত্মনির্ভরশীল, সম্মানজনক ও শক্তিশালী, এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
