ইয়া নবী সালামু আলাইকা
সৈয়দ এ. এফ. এম মঞ্জুর-এ-খোদা
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মসজিদে নববি, মদিনা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী ২৬ আগস্ট বুধবার, পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারি, রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর শুভাগমনের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার দিন। জাহেলিয়াতের অন্ধকারে তিনি এসেছিলেন হেদায়াতের আলো নিয়ে। শিখিয়েছেন তাওহিদ, ন্যায়, সাম্য, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির কালজয়ী শিক্ষা। জীবন ও সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার আদর্শ মানবতার কল্যাণ ও মুক্তির অনন্য পথনির্দেশনা। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষ্যে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের নানাদিক নিয়ে লিখেছেন, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক- ইমাম সৈয়দ এ. এফ. এম মঞ্জুর-এ-খোদা
অন্ধকারে নিমজ্জিত আরব সমাজ
রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে সমগ্র আরব ভূখণ্ড পাপ-পঙ্কিলতা, অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার ঘোর অন্ধকারে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিল। সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে আরবে তখন অশান্তির দাবানল দাউদাউ করে জ্বলছিল। তৎকালীন আরবরা তাদের মনগড়া ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পারস্পরিক অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সমাজ সভ্যতার এতটাই নিকৃষ্ট স্তরে নেমে গিয়েছিল যে, ঐতিহাসিকরা এ সময়কালকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ বা ‘অজ্ঞতার যুগ’ হিসাবে অভিহিত করেছেন।
গোত্রীয় সংঘাতের অবসান
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবরা নিজের ও মিত্র গোত্র ছাড়া অন্যসব গোত্রকে শত্রু মনে করত। ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবনের মতে, জাহেলি যুগে আরবে প্রায় ১৭০০ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনা সনদসহ নানাবিধ যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই গোত্রীয় সংঘাত ও হানাহানি চিরতরে বন্ধ করে দেন। তিনি বিভিন্ন গোত্রের দীর্ঘদিনের শত্রুতা দূর করে তাদের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) তৎকালীন বর্বর আরবদের আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন ও ‘ইলমে তাসাউফ’ বা আধ্যাত্মিক শিক্ষার এমন প্রশিক্ষণ দেন যে, সেই অজ্ঞ ও হিংস্র মানুষগুলো পরবর্তী সময়ে সাহাবিতে পরিণত হন এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন-‘আমার সাহাবিগণ আকাশের নক্ষত্রতুল্য; তোমরা তাদের যারই অনুসরণ করবে, সঠিক পথ পাবে।’ (বায়হাকি, আল-মাদখাল ইলাস সুনান, হাদিস নং : ১৫২)।
তাওহিদের দাওয়াত
একইসঙ্গে পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের অমানবিক শৃঙ্খল ভাঙতে রাসূলুল্লাহ (সা.) যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। হজরত ইসমাইল (আ.)-এর ওফাতের পর কালের বিবর্তনে সমগ্র আরবে পৌত্তলিকতার প্রচলন ঘটে এবং তৎকালীন সমাজ অসংখ্য ভ্রান্ত কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা.) শিরক ও সব ধরনের অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারকে সমূলে উৎপাটন করে এক আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদের দাওয়াত দেন। আর এভাবেই প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে তিনি সমাজকে সব ধরনের কুসংস্কারমুক্ত করেন।
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও কন্যাসন্তান হত্যা বন্ধে আল্লাহর রাসূল (সা.) অসামান্য বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেন। কেননা জাহেলি যুগে নারীকে পণ্যসামগ্রীর মতো মনে করা হতো। সেসময় সবচেয়ে নৃশংস বিষয় ছিল কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর এতিম মেয়েদের সম্পত্তি কুক্ষিগত করা হতো এবং নারীরা ছিল সব ধরনের অধিকারবঞ্চিত। আল্লাহর রাসূল (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির পর কন্যাসন্তান হত্যাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন এবং পরবর্তী সময়ে মদিনায় রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকর করে এ নির্মম প্রথা বন্ধ করেন। তিনি নারীকে মায়ের সুউচ্চ মর্যাদা, স্ত্রীর আইনি অধিকার, কন্যাসন্তানের জীবনের সুরক্ষা এবং মহান আল্লাহর নির্দেশে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসাবে ভূষিত করেন। আর যে পিতা-মাতা কন্যাসন্তান লাভ করবে তাদের প্রতি সুসংবাদ দিয়ে তিনি বলেন-‘যার তিনটি বা দুটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের সঠিক শিক্ষা ও লালন-পালন দিয়ে সুসংগঠিত করবে, সে এবং আমি জান্নাতে পাশাপাশি থাকব।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১৪৭)।
সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা
শুধু নারীর অধিকারই নয়, দাস প্রথার সংস্কার ও সামাজিক সমতা কায়েমেও রাসূল (সা.) নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন। তৎকালীন আরবে প্রকাশ্যে উট-ভেড়ার মতো হাটে-বাজারে মানুষ (দাস-দাসী) কেনাবেচা হতো। মনিবরা দাস-দাসীদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করাত, চিকিৎসাহীন রাখত, চাবুক দিয়ে রক্তাক্ত করত এবং কোনো অপরাধ ছাড়া তাদের হত্যা করলেও মনিবকে কোনো জবাবদিহি করতে হতো না; এমনকি নিজেদের দেব-দেবীর তুষ্টির জন্য মনিবরা দাস-দাসীকে বলি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করত না। এমন পরিস্থিতিতে হজরত রাসূল (সা.) নিজে ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য দাস-দাসী ক্রয় করে তাদের মুক্ত করে দেন এবং বিত্তশালী সাহাবিদেরও দাস-দাসী মুক্ত করার প্রতি ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেন। তা ছাড়া দাস-দাসীদের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-‘তারা (দাস-দাসীরা) তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং, যার অধীনে তার ভাই রয়েছে, সে যেন তাকে তা-ই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তা-ই পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২৩৭৭)।
বংশীয় অহংকারের অবসান
তৎকালীন আরবে আভিজাত্য ও গোত্রীয় বংশমর্যাদা ছিল আরবদের অহংকারের মূল ভিত্তি। উচ্চ বংশীয় আরবরা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ও আধিপত্য চালাত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) বংশীয় ও বর্ণগত সব ধরনের অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ করে বিশ্বজনীন ইসলামি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন-‘হে মানবজাতি! তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতা (আদম) একজন। শুনে রাখ, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবের ওপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালো মানুষের ওপর লাল মানুষের কিংবা লাল মানুষের ওপর কালো মানুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই-শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৪৮৯)।
সুদ, মদ ও জুয়া নির্মূল
সেসময় আরবে সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম হাতিয়ার ছিল সুদ, মদ ও জুয়া। প্রায় ২৫০ ধরনের মদ তৎকালীন আরবে প্রচলিত ছিল। আল্লাহর রাসূল (সা.) পর্যায়ক্রমে মদ ও জুয়ার ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তা সমাজ থেকে চিরতরে নির্মূল করেন এবং সমাজ থেকে সুদের কুপ্রথা চিরতরে নিষিদ্ধ করেন। আর এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা অবতীর্ণ করেন-‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৭৫)। অতঃপর বিদায় হজের দিন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন-‘জাহেলি যুগের সমস্ত সুদ আজ থেকে বাতিল করা হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১২১৮)।
দস্যুবৃত্তি দমন
এ ছাড়া সমাজে দস্যুবৃত্তি দমন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর রাসূল (সা.) কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সেসময় আর্থিক অভাব ও কুপ্রবৃত্তির কারণে আরবে চুরি ও লুটতরাজকে অপরাধ মনে না করে বরং বীরত্ব মনে করা হতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) পরবর্তী সময়ে চুরির অপরাধে সবার জন্য সমান আইনি শাস্তি নির্ধারণ করেন, সেইসঙ্গে আইনের শাসন ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেন। একদিনের ঘটনা-কুরাইশ বংশের এক অভিজাত নারীর চুরির অপরাধে সুপারিশ করা হলে তিনি চরম নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেন-‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এজন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের কোনো অভিজাত বা ধনী ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর সাধারণ বা দুর্বল লোক চুরি করলে তার ওপর দণ্ডবিধি জারি করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৪৭৫)। পরিশেষে বলা যায়, আইয়ামে জাহেলিয়াতের মানবতাহীন সমাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) তার হেদায়েত, প্রজ্ঞা, ইনসাফ ও মহান আদর্শ দিয়ে একটি শান্তিময় সুশীল সমাজে রূপান্তরিত করেছিলেন। বর্তমান বিশ্বেও সামাজিক বৈষম্য ও অনাচার দূর করতে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এই সামাজিক সংস্কারের শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন
সৃষ্টির সূচনা ও নুরে মোহাম্মদী
মহান স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহতায়ালা সৃষ্টির সূচনার আগে এক ও অদ্বিতীয় সত্তা অবস্থায় সব গুণের আধার রূপে বিরাজমান ছিলেন। অতঃপর আল্লাহতায়ালার মাঝে স্বীয় পরিচয় প্রকাশের ইচ্ছা জাগ্রত হলে তিনি সৃষ্টিজগৎ সৃজন করেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা নিজেই এরশাদ করেন-‘আমি ছিলাম গুপ্ত ধনাগার, নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলাম, তাই সৃষ্টিজগৎ সৃজন করলাম।’ (সিররুল আসরার, পৃষ্ঠা ১০ ও ১১)।
আপন রূপ, গুণ ও মাধুর্য প্রকাশের লক্ষ্যে আল্লাহতায়ালা প্রথম তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হাবিব হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নুর তথা ‘নুরে মোহাম্মাদী’ সৃষ্টি করেন, আর নুরে মোহাম্মাদী থেকে আকাশ-পর্বত, গ্রহ-নক্ষত্র, তরুলতা, জিন-ইনসান তথা সব সৃষ্টি রাজি সৃষ্টি করেন। এজন্যই হাদিস শরিফে হজরত রাসূল (সা.) ফরমান-‘আল্লাহতায়ালা প্রথম আমার নুরকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আল্লাহ্র নুর থেকে সৃষ্ট, আর সব সৃষ্টিরাজি আমার নুর থেকে সৃষ্ট।’ (তাফসিরে রূহুল বয়ান, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ৩৭০)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শুভাগমন
উপরোক্ত হাদিস থেকে স্পষ্টতই উপলব্ধি করা যায় যে, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-ই হলেন সৃষ্টিকুলের মূল। এ কারণে আল্লাহতায়ালা স্বয়ং হাদিসে কুদসিতে এরশাদ করেন-‘(হে হাবিব!) আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে কোনো কিছুই সৃষ্টি করতাম না।’ (সিররুল আসরার, পৃষ্ঠা ৭০)।
যার নুরে তামাম মাখলুকাত সৃষ্টি হয়েছে, সেই হজরত রাসূল (সা.)কে কাছে পাওয়ার জন্য সমগ্র সৃষ্টিজগৎ যুগ যুগ ধরে ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিল। অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরম করুণাময় পরওয়ারদেগার হিজরিপূর্ব ৫৩ সালের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার, সুবহে সাদিকের সময় হজরত আবদুল্লাহ (আ.)-এর শাহি প্রাসাদে মা হজরত আমিনা (আ.)-এর কোলে তার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু হজরত মুহাম্মাদ (সা.)কে এ ধূলির ধরায় প্রেরণ করেন।
আল্লাহ ও ফেরেশতাদের দরুদ ও সালাম
যাকে প্রেরণের মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিন আপন মহিমাকে প্রকাশিত করতে চেয়েছিলেন, সেই রাহমাতুল্লিল আলামিন হজরত রাসূল (সা.)-এর জন্মদিন মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের দিন ছিল। তাই হজরত রাসূল (সা.)কে পৃথিবীতে প্রেরণের আনন্দে আল্লাহতায়ালা স্বীয় ফেরেশতাদের নিয়ে তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং বিশ্বাসী বান্দাগণকেও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে সালাম জানানোর নির্দেশ দেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন-অর্থাৎ : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ স্বয়ং ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পড় এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে সালাম পেশ কর।’ (সূরা আল আহযাব-৩৩ : আয়াত-৫৬)।
শুভাগমনে রুহানি জগতের আনন্দ
সুফি সাধকদের মতে, যেদিন হজরত রাসূলে পাক (সা.) পৃথিবীতে শুভাগমন করেছিলেন; সেদিন মহান আল্লাহ নিজে, তাঁর ফেরেশতা, সব আম্বিয়ায়ে কেরাম, সব আউলিয়ায়ে কেরাম রুহানিতে হজরত রাসূল (সা.)-এর শুভ জন্মের আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন এবং তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আসসালাতু আসসালামু ‘আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ;’ আসসালাতু আসসালামু ‘আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ;’ ‘মারহাবা ইয়া রাসূলাল্লাহ; মারহাবা ইয়া হাবিবাল্লাহ্।’ [হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু! আপনার ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে স্বাগত। হে আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু! আপনাকে স্বাগত।]
শ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন
মূলত যার নুর থেকে তামাম জাহান সৃষ্টি হয়েছে, যার শাফায়াত ছাড়া কিয়ামতের দিন কেউ মুক্তি পাবে না, যার ওপর দরুদ না পড়লে কারও প্রার্থনা আল্লাহতায়ালার দরবারে কবুল হয় না, যার শুভাগমনে আল্লাহতায়ালা, ফেরেশতাকুল, আম্বিয়ায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরাম খুশিতে আকুল হয়ে ওঠেন, সেই বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শুভ জন্মদিন হলো সৃষ্টিকুলের জন্য শ্রেষ্ঠ ঈদ তথা সবচেয়ে বেশি আনন্দের দিন। তাই তো মহান আল্লাহ নিজে এ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর দিনে সবাইকে আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে এরশাদ করেন-‘(হে রাসূল!) আপনি মানবমণ্ডলীকে বলে দিন, আল্লাহর ফজল (অনুগ্রহ) ও তাঁর রহমত (দয়া) প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। এটি তারা যা (ধনদৌলত) পুঞ্জীভূত করে, তার চেয়ে উত্তম।’ (সূরা-ইউনূস-১০ : আয়াত-৫৮)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ তাফসিরের কিতাব তাফসিরে দুররে মানছুর-এর ১১ নং খণ্ডের ৩৬৭ পৃষ্ঠায় আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও রইসুল মুফাসসেরিন (শ্রেষ্ঠ তাফসিরকার) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে-‘আল্লাহর বাণী-(হে রাসূল!) আপনি মানবমণ্ডলীকে বলে দিন, আল্লাহর ফজল (অনুগ্রহ) ও তাঁর রহমত (দয়া) প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে। বর্ণনাকারী [হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)] বলেন, এখানে ‘ফাদ্বলুল্লাহ্’ বলতে আল্লাহর অনুগ্রহ তথা ফজল বা ইলমকে বুঝানো হয়েছে। আর রহমত দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.)-কে বোঝানো হয়েছে। যেমনটি আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন, ‘হে রাসূল! আমি আপনাকে জগদ্বাসীর জন্য রহমত (দয়া) হিসাবে প্রেরণ করেছি’ (সূরা আল আম্বিয়া-২১ : আয়াত-২৭)।
সুতরাং, উপরিউক্ত পবিত্র কুরআনের আয়াত ও তার ব্যাখ্যা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, সৃষ্টি জগতের রহমত হজরত রাসূল (সা.)-এর শুভজন্ম ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষ্যে আনন্দ প্রকাশ করা আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য। মূলত এ কারণেই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) বলেছেন-‘যে ব্যক্তি হুজুর (সা.)-এর মিলাদ শরিফকে ইজ্জত ও সম্মান করল, সে যেন ইসলামকে পুনর্জীবিত করল।’ [আন্-নেয়ামাতুল কুবরা আলাল আলম ফি মওলুদে সাইয়্যেদিল আনাম, ইমাম ইবনে হাযার আল হায়ছামী আশ-শাফী (রহ.), পৃষ্ঠা ৭ ও ৮]।
পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় হাবিব হজরত রাসূল (সা.)-এর শুভ জন্মদিন তথা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করে যথাযোগ্য মর্যাদায় তা পালনের সুযোগ প্রদান করুন। আমিন।
রাসূল (সা.)-এর নির্বাচিত ১০টি অমীয় বাণী
১. যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে, সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে, সেই প্রকৃত মুমিন। (তিরমিযি শরিফ, হাদিস নং ২৭৭৫)।
২. যে ব্যক্তি নম্রতা থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৬৩৬৫)।
৩. যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কোনো বিপদ-আপদ দূর করে দেবে, আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিনে তার বিপদ দূরীভূত করবেন। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৬৬০৮)।
৪. সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে খায়, অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে। (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ১১২)।
৫. কিয়ামত দিবসে মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে বেশি ওজনের আর কোনো জিনিস হবে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন। (সহিহ আত-তিরমিযি, হাদিস নং ২০০২)।
৬. মহিয়ান গরীয়ান আল্লাহ কিয়ামতের দিনে বলবেন-হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার খোঁজখবর রাখনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে আপনার খোঁজখবর রাখব, আপনি সারা জাহানের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করোনি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি তার সেবা-শুশ্রূষা করলে তার কাছেই আমাকে পেতে? (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৬৩২২)।
৭. নিশ্চয়ই ধৈর্যের সঙ্গে সাহায্য আসে, বিপদের সঙ্গে মুক্তি আসে এবং কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আসে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ২৮০৩)।
৮. ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারি শরিফ, হাদিস নং ১৩)।
৯. যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা উঁচুতে তুলে দেন। (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৬৩৫৬)।
১০. তোমরা অবশ্যই হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করবে। কেননা, আগুন যেভাবে কাঠকে অথবা ঘাসকে হজম করে ফেলে, অনুরূপভাবে হিংসা-বিদ্বেষও মানুষের নেক আমলকে হজম করে ফেলে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯০৩)।
আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর অতুলনীয় দানশীলতা
মানবিক জাগরণে দানশীলতার গুরুত্ব
সমাজে মানবিক বোধ জাগিয়ে তোলার সেরা মাধ্যম হলো দানশীলতা। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন ও সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে মহৎ কোনো কাজ হতে পারে না। তাই তো মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন-‘তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না, যে পর্যন্ত না নিজেদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করবে।’ (সূরা আলে ইমরান আয়াত-৯২)। আর আল কুরআনের এ নির্দেশনাকে নিজের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাস্তবায়ন করেছিলেন মানবতার মহান শিক্ষক হজরত মুহাম্মাদ (সা.)।
সব মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাতা
দানশীলতায় আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কোনো তুলনা ছিল না; তিনি ছিলেন সব মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাতা। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে-‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। বিশেষ করে রমজান মাসে যখন হজরত জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসতেন, তখন তাঁর দানশীলতা প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও দ্রুত ও ব্যাপক রূপ নিত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫)।
খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না
শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কেউ কিছু চাইলে তিনি জীবনে কখনো ‘না’ বলেননি বা কাউকে খালি হাতে তাঁর দরবার থেকে ফিরিয়ে দেননি। এ প্রসঙ্গে হজরত জাবের (রা.) বলেন-‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কিছু চাওয়া হয়েছে আর তিনি ‘না’ বলেছেন-এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৬০৮)।
সম্পদ জমিয়ে রাখার প্রতি অনাগ্রহ
মূলত, ঘরে কোনো সম্পদ জমিয়ে রাখা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তাঁর দানশীলতার এই বিরল মানসিকতার বড় এক দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে একদিনের একটি ঘটনা থেকে। একবার আসরের সালাত আদায় করে তিনি দ্রুত নিজ গৃহে প্রবেশ করলেন এবং একটু পরই ফিরে এলেন। সাহাবিগণ এর কারণ জানতে চাইলে জবাবে আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন-সালাত শেষে তাঁর মনে পড়েছিল যে, ঘরে সামান্য কিছু স্বর্ণ রয়ে গেছে; ঘরে তা রেখে রাত অতিবাহিত করাকে তিনি অপছন্দ করছিলেন, তাই তখনই তা দান করার নির্দেশ দিয়ে এলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১১৪৮)। একইভাবে, এ বিষয়টি হজরত আবু জার (রা.)-এর বর্ণিত আরেকটি হাদিস থেকেও স্পষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন-‘যদি আমার কাছে ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, তবে ঋণ পরিশোধের অংশটুকু ছাড়া একটি দিনারও তিন দিন জমা রাখা আমাকে আনন্দিত করবে না; বরং আমি তা আল্লাহর বান্দাদের মাঝে ডান, বাম ও পেছনে বিতরণ করে দেব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬০০০)।
মানুষের ঋণ নিজের কাঁধে নিতেন
রাসূলুল্লাহ (সা.) যে শুধু নিজের সম্পদই দান করে গিয়েছেন, তা নয়; বরং তৎকালীন সাধারণ মানুষের ঋণের বোঝাও তিনি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছিলেন-‘আমি মুমিনদের তাদের নিজেদের চেয়েও বেশি শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই কোনো মুমিন ঋণ রেখে ইন্তেকাল করলে তা পরিশোধ করা আমার জিম্মায় থাকবে, আর সে যে সম্পদ রেখে যাবে সেটি তার ওয়ারিশদের জন্য’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২১৫১; সহিহ মুসলিম ৪০৪৯)।
উপহারও অন্যকে দান করতেন
তা ছাড়া কারও কাছ থেকে কোনো উপহার বা উপঢৌকন পেলে তিনি তা নিজে রাখার চেয়ে অন্যকে দিয়ে দিতে বেশি পছন্দ করতেন। এক দিনের ঘটনা-একজন নারী লোক মারফত নিজ হাতে বোনা একটি সুন্দর চাদর দয়াল রাসূল (সা.)-এর জন্য উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। পরে তিনি তা পরিহিত অবস্থায় বাইরে এলে এক সাহাবি চাদরটির খুব প্রশংসা করতে লাগলেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বুঝতে পারলেন সাহাবির চাদরটি পছন্দ হয়েছে; তাই তিনি বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে তৎক্ষণাৎ তা খুলে তাকে দান করলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৬১০)।
গনিমতের সম্পদ অকাতরে দান
বস্তুত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বভাবগতভাবেই এত দানশীল ও উদার ছিলেন যে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে! উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যখন হুনায়নের যুদ্ধের পর অঢেল গনিমতের সম্পদ অর্জিত হলো, তখন তিনি নবাগত মুসলিম ও অভাবীদের মাঝে তা অকাতরে বিলিয়ে দেন। এ বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করা দেখে সাহাবিরা যখন বিস্মিত হলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন-‘বনের বৃক্ষের সমপরিমাণ উটও যদি আমার কাছে আসত, তবুও আমি তা তোমাদের মাঝে দান করে দিতাম। তোমরা আমাকে কখনো কৃপণ বা মিথ্যাবাদী হিসাবে পেতে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২৮২১)। বর্তমান বৈষম্য পীড়িত ও সংকটাপন্ন পৃথিবীতে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এ নিঃস্বার্থ দানশীলতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি; যা সমাজের অসচ্ছল মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে এবং সামাজিক সাম্য ফিরিয়ে আনতে বিশেষ অবদান রাখবে।
