Logo
Logo
×

শেষ পাতা

অনেকে বিপুল বিনিয়োগ করে লোকসানের মুখে

নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধে ছাপাখানায় দুরবস্থা

দেশে সাড়ে ৫ হাজার ছাপাখানার ৩ হাজারই ঢাকায়, সর্বত্রই বিষাদের ছায়া * পুরো সেক্টরই ক্ষতির মুখে পড়েছে

শিপন হাবীব

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধে ছাপাখানায় দুরবস্থা

রাজধানীর ফকিরাপুলে একটি ছাপাখানায় অলস সময় পার করছেন শ্রমিকরা। বুধবার তোলা -যুগান্তর

দেশে প্রথমবার পোস্টারবিহীন জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর আগে নির্বাচন মানেই ছিল পথেঘাটে, সড়কে, ভবনে এখানে-সেখানে নানা রঙের পোস্টার। ভোটারদের কাছে প্রার্থীর পরিচয় ও যোগ্যতা তুলে ধরার প্রধান মাধ্যম ছিল এই পোস্টার। কিন্তু এই ধারায় এবার বাদ সেধেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে আচরণ বিধিমালায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে পোস্টার ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতেই শত শত ছাপাখানায় নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া। নির্বাচন মানেই ছাপাখানার জন্য মৌসুম। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশে প্রতিটি ছাপাখানা ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত সময় পার করে। ইতোমধ্যেই অনেক ছাপাখানা লাখ লাখ টাকার কাগজ-কালি ক্রয়সহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল।

এখন তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ফকিরাপুলের সূচনা প্রিন্টার্সে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ২০-২২ জন শ্রমিক ছাপাখানা ঘিরে বসে আছে। কথা হয় ছাপাখানার সুপারভাইজার আবু সাঈদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তাদের ছাপাখানা বেশ বড়, শ্রমিকদের সংখ্যাও বেশি। এমন বড় ধরনের অনেক ছাপাখানা রাজধানীতে আর অনেক আছে। এসব ছাপাখানায় লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। পোস্টার ছাপা বন্ধ থাকায় এখন শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। সারা বছর যে ব্যবসা হয়, নির্বাচনের ২-৩ মাসে আগে তার চেয়ে বেশি ব্যবসা হয়। লাখ লাখ পোস্টারের অর্ডার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সব শেষ।

প্যারেন্টস ফয়েল প্রিন্টের শ্রমিক শাকিল আহমেদ জানান, ছাপাখানা ব্যবসা প্রায় তিন যুগের। একটি সংসদীয় নির্বাচনে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়। শ্রমিক, মালিকরা বেঁচে থাকত। এখন শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই পেশা ছেড়ে যাচ্ছে। মালিকরা নামমাত্র শ্রমিক রেখেছেন। ভিজিটিং কার্ড, রসিদ আর ছোটখাটো কাজ করে বড় ছাপাখানা চালিয়ে রাখা যায় না। এই সময় ২৪ ঘণ্টা পোস্টার ছাপিয়ে শ্রমিকরা ক্লান্ত হলেও ২-৩ গুণ বেশি টাকা হাতে পাওয়ায় ঈদের দিন মনে হতো।

নয়াপল্টনে প্রায় ৪ যুগ ধরে প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করছেন আমিনুল শেখ। ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, প্রিন্টার্স ব্যবসায় শুধু ছাপাখানার মালিক নন, কাগজ, রং ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরাও এখন বেকায়দায়। যারা প্রিন্টিং ব্যবসায় জড়িত এদের এখন কী হবে? অনেক ব্যবসায়ীদের ঋণ রয়েছে, কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেশিন রয়েছে-এগুলোর কী হবে? রাজধানীর বাবুবাজারের বিসমিল্লাহ প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী বিল্লাল হোসেন বিলুর ভাষ্য, নির্বাচনি পোস্টার ছাপানোর একটি নির্ভরযোগ্য ছাপাখানা এটি (বিসমিল্লাহ প্রিন্টার্স)। দীর্ঘদিনের ব্যবসা, সুনাম, খ্যাতি এভাবে শেষ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি।

রাজধানীর বিজয়নগরেও শত শত ছাপাখানা রয়েছে। আশিক প্রিন্টার্সের সুপারভাইজার জহিরুল ইসলাম জনি যুগান্তরকে জানান, নির্বাচনে প্রার্থীরা পোস্টার ব্যবহার করতে পারবে না-এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এ ব্যবসা মূলত পোস্টারকেন্দ্রিক, পোস্টার ছাপানোর অর্ডার না পেলে এ ব্যবসায় তেমন লাভ নেই। তাছাড়া ডিজিটাল যুগে এখন ওয়াজ-মাহফিল কিংবা যে কোনো প্রচার-প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইদানীং ভিজিটিং কার্ড ছাপাও কমে গেছে, সবই নেট দুনিয়ার কারণে। এমন অবস্থায় নির্বাচনি পোস্টার ছাপানো বন্ধের নির্দেশনা-পুরো সেক্টরকে ক্ষতির মুখে ফেলছে।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে সাড়ে পাঁচ হাজার মুদ্রণ কারখানা তথা ছাপাখানা রয়েছে। এর মধ্যে বড় এক হাজার, মাঝারি দুই হাজার ও ক্ষুদ্র কারখানা আড়াই হাজার। সর্বোচ্চ তিন হাজারের বেশি মুদ্রণ কারখানা রয়েছে ঢাকায়। এসব কারখানা মূলত রাজধানীর আরামবাগ, নয়াপল্টন, বিজয়নগর, কাঁটাবন, নীলক্ষেতসহ পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, বাবুবাজার, বাংলাবাজার, ইসলামপুর, লালবাগ প্রভৃতি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে। ঢাকা পেপার অ্যান্ড প্রিন্টিং ইঙ্ক মার্চেন্টেস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আফসার সেলিম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের পোস্টার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে দেশের সব কাগজ ব্যবসায়ীদের ক্ষতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। তার দাবি-দীর্ঘদিন ধরে কাগজ ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। মন্দা পরিবেশের মধ্যে সরকারের ভ্যাট, ট্যাক্স, কর্মচারীর বেতন, লেবার খরচ, প্রিন্টিং খরচ, দোকান ও গোডাউন ভাড়া এবং উচ্চ সুদে ব্যাংক লোন এখন ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা। সরকারের উচিত এসব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর পাশে দাঁড়ানো এবং যারা উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে-তাদের সুদ মওকুফ করে দেওয়া।

এশিয়ান প্রিন্টের মালিক আরিফুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি নির্বাচনে আমাদের টার্গেট থাকে পোস্টার বিক্রি করে ২০-৩০ লাখ টাকা আয় করার। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। মা পেপার হাউজের মালিক সেলিম গাজী যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ব্যবসার পরিবেশ ভালো না। ব্যবসায় টিকে থাকা দায় হয়ে গেছে। এমন খারাপের মধ্যেই আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরপরই বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছি।

কমন পেপার হাউজের মালিক নূর আলম যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় কিংবা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে আমাদের ব্যবসা ভালো হয়। প্রায় সারা দেশে আমাদের তৈরি পোস্টার বিক্রি হতো। শুধু যে প্রার্থীরা এসব পোস্টার নেন তা নয়, কিছু কিছু ব্যবসায়ী আছেন, যারা প্রার্থীদের পোস্টার উপহার দেন-তারা আমাদের কাছে পোস্টার অর্ডার করেন। সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের বিষয়গুলো বিবেচনা করেনি।

স্টিকার ওয়ার্ল্ডের মালিক মো. জহির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনি পোস্টার ঘিরে বিপুল পরিমাণ কাগজ সংরক্ষণ, ব্যাংক লোন, অধিক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়াসহ নানা কাজ আমরা করেছি। অনেকে অতিরিক্ত কাগজ কিনে গোডাউন ভর্তি করে ফেলেছেন। পোস্টার নিষিদ্ধ মানে এসব কাগজ আর সহজে বিক্রি হবে না। বিক্রি না হলে-ছোট-বড় সব ব্যবসায়ীকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

নেতাকর্মীদের অনেকে জানান, খেতখামার ছাড়াও গাছে গাছে পোস্টার যেন বাংলাদেশের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল না কখনোই।

নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী, এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়া নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে হবে। আচরণবিধি ভাঙলে ওই ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিধান লঙ্ঘনে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলেরও বিধান রয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে এআইয়ের অপপ্রয়োগ ও ড্রোন ব্যবহারেও ইসির নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম