Logo
Logo
×

শেষ পাতা

জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৩ শতাংশ

শিপন হাবীব

শিপন হাবীব

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থী মাত্র ৩ শতাংশ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। ২৯৮ আসনে (দুটি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত হবে ২৬ জানুয়ারি) এসব দলে এক হাজার ৯৬৭ প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীই দেয়নি। বাকি ২১ দলের ৬৩ জন নারী সরাসরি নির্বাচন করছেন। শতকরা বিচারে তা মোট প্রার্থীর মাত্র ৩ শতাংশ। বড় দল বিএনপি ২৮৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন মাত্র ৯ নারী। বিশেষজ্ঞ ও নারী উন্নয়ন নেত্রীরা বলছেন, যেখানে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা তাদের প্রতিভা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, দুজন নারী দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন-সেখানে রাজনীতিতে নারী প্রার্থীর এ অবস্থান হতাশার। এটি নারীর ক্ষমতায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

সূতমতে, এবার জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) ২ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৫, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ২, গণসংহতি আন্দোলন থেকে ৪, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে ৩, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্কসবাদী) থেকে ৮, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি থেকে ৬, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ৬ ও গণফোরাম থেকে ২ জন নারী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জাতীয় পার্টি-জেপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), আমজনতার দল, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে ১ জন করে নারী প্রার্থী রয়েছেন।

এছাড়া স্বতন্ত্র হিসাবে লড়াইয়ে রয়েছেন সাত নারী। এর মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী (প্রার্থিতা ঘোষণার পর দল থেকে বহিষ্কার) প্রার্থী সাবেক এমপি রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ও এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা (ঢাকা-৯)। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসের মতো বড় দলে কোনো নারী প্রার্থী নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, নারী প্রার্থী কম হওয়ার পেছনে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কলাকৌশল। তাছাড়া দলগুলোও চায় না বেশি নারী প্রার্থী নির্বাচন করুক। এই পরিস্থিতি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন সরকার ৩০ শতাংশ আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবায়ন আজও হয়নি। রাজনৈতিক দলে যেসব নারীরা শীর্ষ পর্যায়ে আছেন, এদের অনেকেই নির্বাচন করতে পারছেন না। অথচ দলগুলো বলে বেড়াচ্ছে, নারী প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

জুলাই সনদ প্রণয়নে সম্পৃক্ত একজন বলেন, জুলাই সনদে নারী প্রার্থী মনোনয়নে ন্যূনতম ১০ শতাংশ রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল। বাস্তবে এবার বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তা মানেনি। জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলও নারীদের মনোনয়ন দেয়নি, যা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার চিত্র। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে বিএনপি প্রথমে ১০ জন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর সেই সংখ্যা নেমে আসে ৯ জনে। বিএনপি ২৮৯টি আসনে ধানের শীষে নির্বাচন করছে। বাকি ৯ আসন মিত্র দলগুলোর জন্য ছেড়ে দিয়েছে। অথচ ২৮৯ আসনের মধ্যে ৩০ শতাংশ হলে ৯৬ জন নারী সরাসরি নির্বাচন করতে পারতেন। এনসিপিতে ৩০ আসনের বিপরীতে নারীর সংখ্যা হতো ৯ জন।

জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব ও প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় পার্টি ১৯৬ আসনে বৈধ প্রার্থী পেয়েছে। আমাদের দলে ৫ জন নারী প্রার্থী সরাসরি নির্বাচন করছেন। নারী প্রার্থী আরও কি করে বাড়ানো যায়, এ বিষয়গুলো নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে, এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী এবার ২২৬ আসনে নির্বাচন করছে। এর মধ্যে একজনও নারী নেই। অতীতেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি নারী প্রার্থী দেয়নি। যদিও সংরক্ষিত নারী আসনে কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের নারী প্রতিনিধিত্বের নজির আছে। দলটির নারী শাখাও রয়েছে। তবু সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী না দেওয়ার পেছনে দলীয় নেতারা তিনটি যুক্তির কথা বলছেন। এগুলো হলো-পর্দা মেনে গণসংযোগের বাস্তবতা, আগ্রহের ঘাটতি ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা।

এ বিষয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির যুগান্তরকে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রার্থী মনোনয়ন শুধু হতাশাজনক নয়, বরং জাতীয় প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার শামিল। ১৯৯৫ সালের বেইজিং সম্মেলনের তিন দশক পর এসেও যখন দেখি নারী প্রার্থীর হার তলানিতে, তখন স্পষ্ট হয় যে রাজনৈতিক দলগুলো নারীকে শুধু ‘ভোটার’ হিসাবে দেখতে চায়, নীতিনির্ধারক হিসাবে নয়। মনে রাখবেন, নারীর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে। জনমুখী রাজনীতি নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া অপূর্ণ। ক্ষমতার এই অসামঞ্জস্য দূর করতে না পারলে উন্নত ও ন্যায্য রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন কখনোই টেকসই হবে না।”

ফারাহ কবির প্রশ্ন তোলেন, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলোতে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ যে নারী রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, নীতিনির্ধারণী টেবিলে তাকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কেন? রাজনীতি যদি জনগণের কল্যাণের স্বার্থে হয়, তবে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে সেই কল্যাণ কীভাবে সম্ভব?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর তানিয়া হক যুগান্তরকে বলেন, দেশে নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। অথচ রাজনৈতিকভাবে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীদের কোনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অথচ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো পুরুষ আধিপত্যশীল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরও রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।

তানিয়া হক আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও নারীবান্ধব নীতির ঘাটতির কারণেই নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজ মানতেই চায় না-মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তার মতে, পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার কাঠামো, মনোনয়ন বাণিজ্য, নির্বাচনি ব্যয়ের চাপ এবং সহিংস রাজনীতির আশঙ্কাও নারীদের বড় বাধা। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক চাপও নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়-আমাদের দল চেষ্টা করছে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে। শুরুতে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি ছিল। বহু নারী প্রার্থীকে প্রার্থিতাও দেওয়া হচ্ছিল। এখন জোটের মধ্যে থেকে নির্বাচন করতে হচ্ছে। রাজনীতিতে, জনপ্রতিনিধিত্বে নারীর অংশগ্রহণ অধিকার। সেই অধিকারকে এগিয়ে নিতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার থাকা উচিত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম