দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ
সাড়ে তিন বছরের প্রকল্পে যাচ্ছে ১৬ বছর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বের ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত মেগা প্রকল্প ছিল ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ।’ সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য থাকলেও এখন সময় লাগছে ১৬ বছর। শেষ পর্যায়ে এসে আরও ৬ মাস মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে ২৫ জানুয়ারি। প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এটিই হবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেক বৈঠক। এ কারণে প্রস্তাবিত সংশোধনীসহ মোট ২৫টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বুধবার যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পিসিআর তৈরি, অডিট নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষ করতে তাদের কিছুটা সময় প্রয়োজন। চতুর্থবার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে এটি একনেক বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এর মধ্যে বাস্তবায়ন না হওয়ায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এতেও শতভাগ কাজ শেষ হয়নি। ফলে এবার ৬ মাস বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
এদিকে শুরু থেকেই প্রকল্পটির নাম ছিল ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ।’ কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে এ প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে। পরে ব্যয় কমাতে অপ্রয়োজনীয় অংশ বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়েছে রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণকাজ। ফলে ব্যয় কমেছে ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির বিষয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, কক্সবাজার-গুনদুম প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার আগে গভীরভাবে চিন্তা করা হয়নি। কেননা তখন বলা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়ন করা হলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো গুনদুমের ওপারে মিয়ানমারে শুধু পাহাড়ি এলাকা। সেখানে ওপারে রেললাইন তৈরির কোনো পরিকল্পনাও নেই। তাহলে এত টাকা ব্যয় করে অপরিকল্পিত প্রকল্প নেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল।
পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তবে রামু-গুনদুম অংশের জন্য অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এছাড়া মিয়ানমারে যে সংঘাতময় অস্থির পরিস্থিতি চলছে, সেখানে ট্রান্স-এশিয়ান রেল সংযোগ স্থাপন আপাতত সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের নিজস্ব তহবিলের বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করাটা যৌক্তিক হবে না। এটা বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বাদ দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৮১৫ কোটি ৪৭ লাখ এবং এডিবির ঋণ ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের কার্যক্রম বাদ দেওয়ায় মোট ১১ হাজার ৩৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২ হাজার ৬৯৬ কোটি ৩৫ লাখ এবং এডিবির ঋণ থেকে ৮ হাজার ৬৩৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, সর্বশেষ অনুমোদিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত মোট ১২৮ কিলোমিটার ভূমি অধিগ্রহণসহ রেল ট্র্যাক নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে রামু থেকে গুনদুম পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণসহ ২৮ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক নির্মাণ অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনীতে নতুন ৮টি ফুটওভার ব্রিজ, কক্সবাজারে বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের ক্যাপাসিটি ৬০০ কেভিএ থেকে ২০০০ কেভিএ-তে উন্নীতকরণ এবং লেভেল ক্রসিং গেটের পরিবর্তে ৪৬টি সড়ক আন্ডারপাস নির্মাণকাজ যুক্ত করা হয়। আরও আছে নতুন করে ৪টি বক্স কালভার্ট নির্মাণ, প্ল্যাটফর্ম শেডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিসহ নতুন প্ল্যাটফর্ম শেড নির্মাণ, কক্সবাজার রেলওয়ে রেস্ট হাউজ দোতলা থেকে ৫ তলায় উন্নীতকরণ। এসব কাজ ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নতুন করে ৬ মাস মেয়াদ বাড়ানোর কারণ হিসাবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণে দেরি, বনভূমি ডি-রিজার্ভকরণ ও বনভূমি ব্যবহারের অনুমতি পেতে দেরি, নতুন প্ল্যাটফর্ম শেড নির্মাণ এবং সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে প্রকল্পের কার্যক্রম দেরি হয়েছে। আরও আছে স্টেশনগুলোর ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, অপারেশনাল সুবিধা বাড়ানো, সিগন্যালিং সিস্টেম আধুনিকীকরণ, আন্ডারপাস নির্মাণ, প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল তৈরি এবং সেন্সর ক্যামেরা লাগানোর কাজ বাকি থাকায় মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন।
একনেকে উঠতে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রকল্প হলো-চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিংরোড প্রকল্পের পঞ্চমবার মেয়াদ বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, স্যানিটেশনে নারী উদ্যোক্তা এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সিলেট টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ তৈরি। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা এবং পদ্মা নদীর উভয় তীর সংরক্ষণ। বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট এবং কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।

