‘লো প্রোফাইল-হাই রিস্ক’ কৌশল
ঢাকায় নীরবে সক্রিয় অপরাধজগৎ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অত্যন্ত নীরবে ও পরিকল্পিতভাবে সক্রিয় ঢাকার অপরাজগৎ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে ‘লো প্রোফাইল-হাই রিস্ক’ কৌশলে নতুন করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে অপরাধীরা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তিন শতাধিক চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধীর চলাচল ও কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এখনো এ ধরনের কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি। এ কারণে নির্বাচন সামনে রেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেখার সুযোগ নেই। তালিকায় গুরুত্ব না দিয়ে বরং টার্গেটেড অপারেশনে জোর দেওয়া হচ্ছে।’
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী ও দক্ষিণখান এলাকায় পুরোনো সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের গ্যাংগুলো নেটওয়ার্কভিত্তিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরাসরি মাঠে না নেমে মধ্যস্থতাকারী, কিশোর গ্যাং ও পেশাদার হিটম্যান ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সন্ত্রাসী এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছে। ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিচ্ছে তারা। তবে মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীরা তাদের বসদের পুরো পরিকল্পনা জানে না। বিভাজিত এ কৌশলই বর্তমানে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মূল শক্তি। এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আগে নামকরা মস্তানদের দেখা যেত। এখন কাজ করছে ‘শ্যাডো নেটওয়ার্ক’। ছোট ছোট সেল, তাদের মাঝে সীমিত যোগাযোগ; কিন্তু আঘাত মারাত্মক।
এ বাস্তবতায় অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে ডিএমপি একাধিক নীরব উদ্যোগ নিয়েছে। তবে অভিযানের স্বার্থে এসব কার্যক্রম প্রকাশ করা হচ্ছে না। নির্বাচন সামনে রেখে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন চলছে সমন্বিতভাবে। একদিকে ২০০১ সালে ঘোষিত শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর পুরোনো তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে; অন্যদিকে থানা, ওয়ার্ড ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ‘রিস্ক ম্যাপ’ প্রস্তুত করা হয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিভিন্ন অভিযানে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। বিদেশি পিস্তল, সাইলেন্সার, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ও উন্নত দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র মিলছে। অপরাধে জড়ানো তরুণদের বড় একটি অংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর। এ কারণে নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী টার্গেটেড ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবন দেখা, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া অনেক তরুণকে অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধজগতের তৎপরতাও বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং অবৈধ অর্থ সংগ্রহে এসব চক্রকে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশ্যে কেউ দায় স্বীকার না করলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব স্পষ্ট।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সমস্যা হলো-তারা (অপরাধীরা) চোখে পড়ে না। ঘটনা ঘটার পর সূত্র পাওয়া যায়। প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে আমরা নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টা করছি।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীতে সার্বিকভাবে অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না-এটি ডিএমপি কমিশনারের স্পষ্ট নির্দেশনা।’ তিনি বলেন, ‘সিএমপি যে উদ্যোগ নিয়েছে, সে ধরনের ব্যবস্থা ডিএমপি অনেক আগেই গ্রহণ করেছে।
ডিএমপি অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বারবার একই অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজধানীর বাইরে বসবাসের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা পুলিশ কমিশনারের রয়েছে এবং এই বিধান ইতোমধ্যে প্রয়োগ করা হয়েছে।’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ সায়েন্স ও ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি একটি সংগঠিত ব্যবস্থা। অর্থ, রাজনীতি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নীরব অপরাধযন্ত্র ভাঙতে হলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।’
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুছাব্বির, পল্লবীর স্থানীয় যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়া, ঢাকার আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারেক সাইফ মামুন হত্যাসহ সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত ঘটনার নেপথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার অপরাধজগৎ আর পাড়া-মহল্লায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে।
ডিএমপির এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের আগে দাগি আসামি, জামিনে থাকা অপরাধী এবং নতুনভাবে সক্রিয় নব্য অপরাধীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুরোনো মামলার ভিত্তিতে গ্রেফতার অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে অতীতে নির্বাচনি সহিংসতা, চাঁদাবাজি বা কেন্দ্র দখলের অভিযোগ রয়েছে, তাদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মতিঝিল বিভাগের এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচন এলেই কিছু লোক প্রার্থীর জন্য লোক সরবরাহ, ভয় দেখানো আর চাঁদাবাজি শুরু করে। এবার আমরা শুরু থেকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।’
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেকনাফ, বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অন্তত ১৮টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। এছাড়া ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের সময় লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। আর হুন্ডি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহের মাধ্যমে অপরাধী চক্রের তহবিল জোগানের তথ্যও মিলেছে। এসব অর্থ নির্বাচনের সময় ক্যাডার ভাড়া, অস্ত্র সংগ্রহ ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়।

