Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

নতুন সরকারের নীতি নিয়ে ড. দেবপ্রিয়

স্বপ্নেও টাকা ছাপানোর চিন্তা করা ঠিক হবে না

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বপ্নেও টাকা ছাপানোর চিন্তা করা ঠিক হবে না

দেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে জনতুষ্টিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ধৈর্য ও সংযম দেখাতে হবে। স্বপ্নেও টাকা ছাপানোর চিন্তা করা ঠিক হবে না সরকারের।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন।

তার মতে, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়নে সরকারের একটা ট্রানজিশন টিম বা উত্তরণকালীন দল গঠন করা উচিত। দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দলটি পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। এতে সরকারের জন্য কাজ করা সহজ হবে।

ব্রিফিংয়ের বিষয় ছিল-‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু : অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’। এতে বক্তব্য দেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ‘অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ পরিস্থিতি যেভাবে পেয়েছিল, তার চেয়ে আরও নাজুক অবস্থায় রেখে গেছে। পতিত সরকারের নেওয়া ঋণ ফেরত দিতে গত অর্থবছরে ৬০ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সরকারের চলতি ব্যয় মেটাতে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এরশাদ সরকারের পর চলতি ব্যয় মেটাতে কখনো এত ঋণ নেওয়া হয়নি।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংক থেকে লুট হওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছে এ সরকার। এ টাকা ফেরত দিতে প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। জিরো টলারেন্স নীতি ছাড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না। সবার আগে দল থেকে এই ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিদেশি ঋণের চাপ আগামী সময়ে আরও বাড়বে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে না গেলে এ সরকারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়বে। বক্তারা বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে লাভজনক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে ছাড়তে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পেছাতে বুধবার জাতিসংঘে চিঠি দিয়েছে সরকার।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার কৃচ্ছ না করুক, অন্তত সংযম দেখাতে হবে। এতে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্য অসুবিধাগুলো খুবই পরিষ্কারভাবে ভাগ হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে নতুন সরকার এসেছে। রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে তারা যথেষ্ট সামর্থ্যবান। নতুন সরকার যখন আসে, তখন আগের সরকার কী রেখে যাচ্ছে, কী দিয়ে যাচ্ছে, নতুন চ্যালেঞ্জ কী হতে পারে, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে মূল্যায়ন জরুরি। উত্তরণকালীন দলের মাধ্যমে আগের সরকারের কার্যক্রমের ময়নাতদন্ত করতে হবে। উত্তরণকালীন দল প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি ডকুমেন্ট তৈরি করতে পারে।’

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘ডকুমেন্টে দায়-দেনা পরিস্থিতি, বিগত সরকার যে সব ক্রয়চুক্তি করে গেছে, সেগুলোকে আরও ভালো করে পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। এই চুক্তিতে কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না বা কোনো নিয়মনীতি ভঙ্গ হয়েছে কি না, দেখা দরকার।

বিগত সরকার যাওয়ার আগে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দর চুক্তি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও চুক্তি হয়েছে। যা আমরা অবহিত নই। এসব বৈদেশিক চুক্তিকেও আবার পুনরায় বিবেচনা করা উচিত। কারণ নতুন সরকারের কাছে এর কী ধরনের দায়দায়িত্ব বর্তায়, সেটি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। যেহেতু সরকার এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি পুনঃমূল্যায়ন করতে রাজি আছে।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা চলতি অর্থবছরে না করাই ভালো। জিরো টলারেন্স ছাড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ-সদস্য ও মন্ত্রীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসাবে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৯ হাজার ৬০০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। এছাড়াও কাদের কীভাবে এটি দেওয়া হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে। সেটা অনুসরণ এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করতে পারলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এর ব্যাখায় দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ড দিলে এই কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে। অন্যদিকে কার্ড নির্ধারণের জন্য প্রকৃত ডাটার ঘাটতি থাকতে পারে। সেজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য, তারা পাবেন।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশীয়, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্যের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়ানো জরুরি। এলডিসি উত্তরণের সময় ৩ বছর পেছানোর জন্য নতুন সরকার আবেদন করেছে। এটি জাতিসংঘ বিবেচনা করবে। তবে তার মতে, কাঠামোগতভাবে এটি সম্ভব নয়। কারণ, এলডিসি উত্তরণ সংক্রান্ত তিনটি সূচকের মধ্যে সবকটিতে বাংলাদেশ ইতিবাচক। এখন বাংলাদেশকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলতে হবে, আমাদের এই অবস্থা টেকসই নয়। তবে জাতিসংঘে বিতর্ক হবে। এই বির্তকের পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে।

তৌফিক ইসলাম খান বলেন, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে, এমন উচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে লক্ষ্য অর্জনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর সংস্কার ও শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে নতুন সরকারের ১০টি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম