Logo
Logo
×

শেষ পাতা

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ

ভাগ্য নির্ধারিত হবে প্রথম অধিবেশনে

শেখ মামুনুর রশীদ

শেখ মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভাগ্য নির্ধারিত হবে প্রথম অধিবেশনে

বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই নির্ধারিত হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে ১২ মার্চ। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় বা সংসদ অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে বলে প্রতীয়মান হলে তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫৯ দিনের শাসনামলে তড়িঘড়ি করে অনেক অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গড়ে ৫ দিনের একটু কম সময়ে একটি করে অধ্যাদেশ জারি করা হয় তখন। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ অধিবেশন বসার এক মাসের মধ্যে এগুলো আইনে পরিণত করতে হলে বর্তমান সরকারকে দিনে গড়ে সাড়ে চারটি করে অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করতে হবে।

সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই প্রত্যেকটি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে এত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে; যে প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়ে ৫ দিনের কম সময় লেগেছে। তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশন বসা থেকে ৩০ দিনের মধ্যে যে অধ্যাদেশগুলোর আইনি ভিত্তি দেওয়া সম্ভব হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত বা বাতিল হয়ে যাবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের ৩ দিন পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রথম থেকেই এই সরকারের প্রতি সমর্থন জানায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সে সময় সক্রিয় সব রাজনৈতিক দল। আইন মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম বছরে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার আগপর্যন্ত ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার যখন কিছু আদেশ এবং একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করেছে, তখনই স্পর্শকাতর কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির আপত্তি ছিল। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য আদেশ জারি করার সময়ই আপত্তি জানায় দলটি। বিএনপি এ ধরনের আদেশ জারির এখতিয়ার নিয়েও তখন প্রশ্ন তোলে। এরকম আরও বেশকিছু অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির আপত্তি রয়েছে। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি এমন ব্যক্তিদের বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।

এছাড়া রাজধানীর সাত সরকারি কলেজ নিয়ে গঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছর করা হয় যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, সেই অধ্যাদেশকেও স্পর্শকাতর হিসাবে বিবেচনা করছে বিএনপি। এ অধ্যাদেশ নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে তারা। তবে বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কিত বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং নির্দিষ্টকরণ আইন নিয়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করতে হবে। তাই এ সংক্রান্ত আদেশে হাত দেবে না বিএনপি। যদিও দায়মুক্তি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাসহ স্পর্শকাতর আরও কিছু বিষয়ে অধ্যাদেশের ব্যাপারে দলটি এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার একজন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ অধ্যাদেশ সংসদ গ্রহণ করবে না। কারণ আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিগত সরকার হাতেগোনা কয়েকটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। আবার অনেক আদেশই তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে করেছে। যেটা তাদের করার দরকার ছিল না, এমনকি করার কথাও ছিল না, এমন কাজও তারা করেছে। এখন সরকার চাইলে এসব অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন নাও করতে পারে। ওই কর্মকর্তার মতে, সরকার বেছে বেছে কিছু অধ্যাদেশ সংসদে তোলার পর সংসদ-সদস্যদের মতামত নিয়ে সেগুলো আইনে পরিণত করবে। কোন কোন অধ্যাদেশকে সরকার আইনে পরিণত করতে চায়, তা যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর সংসদের অনুমোদন নিয়ে সেগুলো আইনে পরিণত করা হবে। তিনি আরও বলেন, যেসব অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে, সেগুলোও হুবহু করা হবে না বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এতে পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন করে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করা হবে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের ঘোষিত সংস্কার নীতিতে বর্তমান সরকার প্রাধান্য দেবে, এটাই স্বাভাবিক।

সরকার ও সংসদ সচিবালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশের বেশির ভাগই আইনে রূপান্তর হচ্ছে না। আর যেগুলো আইনে পরিণত করা হবে, সেগুলো এখন যাচাই-বাছাই চলছে। এরপর তালিকা চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। অধিবেশন বসার আগেই যেসব অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত হবে, সেগুলোর খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। সূত্রগুলো বলছে, কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে কয়েকটি অধ্যাদেশ জারির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সব অধ্যাদেশ জারি হয়েছে কিনা, সে নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং একেবারে প্রয়োজনীয় কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করা হচ্ছে। সেগুলোই সংসদে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করার প্রস্তুতি চলছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম