Logo
Logo
×

শেষ পাতা

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬

বিক্রি কমেছে ৮০ শতাংশ আজ ভাঙবে মিলনমেলা

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিক্রি কমেছে ৮০ শতাংশ আজ ভাঙবে মিলনমেলা

বাঙালির অন্যতম প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর শেষ দিন আজ। প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে মেলা ১৭ দিন পার করেছে। মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি স্টল ভাড়া মওকুফসহ নানা ছাড় দিয়ে মেলা জমানোর চেষ্টা করেছে। মেলা শেষ পর্যন্ত জমে ওঠেনি। প্রকাশকদের একটা বড় অংশের আশঙ্কাই সত্য হলো। রমজান মাসে অনুষ্ঠিত বইমেলায় আর্থিক ক্ষতি হলেও ৬টি শিশু প্রহর, আলোচনা, শিশুদের গান, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সফলতা দেখছে বাংলা একাডেমি। জাতীয় নির্বাচনসহ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবার মেলা হয়েছে। অমর একুশে বইমেলার ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই একটা সফলতা।

এদিকে আশানুরূপ ক্রেতা না পাওয়ায় প্রকাশকদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে, এর মধ্যে শুক্রবার রাতের বৃষ্টিতে অন্তত পঞ্চাশের অধিক স্টলের বই ভিজে গেছে। বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠে ইউপিএলের প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় বই বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। সংগঠনটির মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রমজান মাসে মেলা আয়োজন এবং পাঠক উপস্থিতি কম থাকার কারণে এবারের মেলায় অধিকাংশ প্রকাশক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারী ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রকাশকের স্টলে পাঁচ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।

প্রকাশক ঐক্যের নেতারা বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি কমেছিল ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ। সেই ধারা অব্যাহত থেকে চলতি বছরে বিক্রি আরও কমে গেছে। তাদের মতে, এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালের মেলার চেয়েও খারাপ।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলা হয়, প্রকাশকদের স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। যদিও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ ইউনিটের বেশি স্টল দেওয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। প্রকাশক ঐক্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্যাভিলিয়ন প্রথা বাতিল করায় বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানানো হয়।

এ অবস্থায় প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে প্রকাশক ঐক্য। এর মধ্যে রয়েছে-ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের সহায়তায় সরকারিভাবে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি কেনা, প্রকাশনা খাতের জন্য সরকারি বই ক্রয়ের বাজেট বৃদ্ধি এবং প্রকাশনা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া স্কুল-কলেজের লাইব্রেরি উন্নয়ন, বন্ধ হয়ে যাওয়া লাইব্রেরি পুনরায় চালু করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘লাইব্রেরি ক্লাস’ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেশব্যাপী পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অনন্যা প্রকাশনীর প্রকাশক মনিরুল হক, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, আদর্শ প্রকাশনীর মাহবুবুর রহমান এবং অ্যাডঅন পাবলিকেশনের সৈয়দ জাকির হোসেনসহ প্রকাশক ঐক্যের নেতারা।

শনিবার মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে-মেলার বহু স্টলের সামনে বৃষ্টিতে ভেজা বই বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বই উদ্যান, বিদ্যাপ্রকাশ, চন্দ্রবতী, ইন্তামিন প্রকাশনী, প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স, অন্বেষা প্রকাশন, উড়কি, আদর্শ, টাঙ্গন, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, বুনন, নাগরী, প্রতিভা প্রকাশ, চারুলিপি, শাপলা প্রকাশ, পুথিনিলয়, বিজ্ঞান একাডেমি, স্বপ্ন ৭১, অমর প্রকাশনী, মুক্তধারাসহ আরও বেশকিছু প্রকাশনা সংস্থার বই ভিজে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুথিনিলয় ও বিজ্ঞান একাডেমি। ঝড়োবাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি বিজ্ঞান একাডেমির স্টলের ছাউনি ভেঙে পড়ে এবং প্রায় সব বই ভিজে যায়, আর পুথিনিলয়ের স্টলে রাখা প্রায় ৭০ শতাংশের মতো বই ভিজে নষ্ট হয়েছে। বিজ্ঞান একাডেমির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান-শনিবার রাতে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মুষলধারার বৃষ্টিতে এই বইগুলো ভিজে গেছে। আমাদের স্টলের ছাউনি ভেঙে পড়েছে। এখন ভেজা বই শুকাচ্ছি। আর বিক্রির জন্য নতুন করে বই নিয়ে এসেছি; সেগুলো স্টলে সাজিয়ে রেখেছি।

এর আগে মেলার শেষ শিশু প্রহরে বেলা ১১টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি। কবিতা পাঠে অংশ নেন ৩০ জন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী এবং ২টি আবৃত্তি সংগঠন (এনামুল হক জুয়েলের পরিচালনায় জাতীয় আবৃত্তি পরিষদ এবং মো. রবিউল আলম রবির পরিচালনায় শিশুনন্দন)। শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকরা এই আয়োজন উপভোগ করেন। এছাড়া মেলার অন্য প্রাঙ্গণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশুরা বিগত শিশু প্রহরের মতোই পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ ও শিশুতোষ বই সংগ্রহের মধ্য দিয়ে নিজেদের উচ্ছ্বাসমুখর রেখেছে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ : বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে ‘জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ শীর্ষক আলোচনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন ক্ষণে মোরশেদ শফিউল হাসান বলেন, সাহিত্যিক সংগঠন বা গোষ্ঠী হিসাবে মুসলিম সাহিত্য সমাজের যাত্রা শুরু হয়। বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য নিয়েই ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেখকেরা মূলত সে সময়কার প্রচলিত সাহিত্যিক বাংলাতেই তাদের লেখালেখি করেছেন, যে ভাষাতে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই সাহিত্যচর্চা করতেন। বাঙালি মুসলমানের জন্য বাংলা ভাষা চর্চা কিংবা শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে এ ভাষার অপরিহার্যতার বিষয়টি গোড়া থেকেই মুসলমান সাহিত্য সমাজের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের চিন্তায় গুরুত্ব পেয়েছিল। তারা মনে করতেন মাতৃভাষার মধ্য দিয়েই জগতের ভাবধারার সঙ্গে সমাজকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত, তা হলেই আমাদের পক্ষে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়া সহজ হবে। বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আর্থিক দারিদ্র্যের জন্য তারা মাতৃভাষা নিয়ে বাঙালির দ্বিধান্বিত অবস্থান ও হীনম্মন্যতাকে দায়ী করেছিলেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সভাপতিত্বে আলোচকের বক্তব্য দেন মমতাজ জাহান।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক-অনুবাদক শাকির সবুর, প্রাবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব। আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

গুণিজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ ঘোষণা : অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিকসংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬; ঐতিহ্যকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার-২০২৫; পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্সকে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার; সহজ প্রকাশকে সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার এবং ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গলবুকসকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে। আজ মেলামঞ্চে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

অমর একুশে বইমেলার সমাপনী দিনে আজ মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম