যশোরের উলাসী-যদুনাথপুর
জিয়ার নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খনন করা প্রথম খাল
রাষ্ট্রপতি জিয়া মাটি কেটে ঝুড়িতে দেন; সেই ঝুড়ি আমার ভাই মাথায় বয়ে নিয়ে যায়-আবদুল বারিক মণ্ডল
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী-যদুনাথপুর খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। খনন কাজে অংশ নেওয়া শতবর্ষী আব্দুল বারিক মণ্ডল মঙ্গলবার দেখাচ্ছেন খালের বর্তমান অবস্থা -হাসফিকুর রহমান পরাগ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকেই চোখে পড়ল, বাম পাশে খালের ধারে গাছতলায় অযত্ন-অবহেলায় রয়েছে একটি ফলক স্তম্ভ। দূর থেকে ঠিক পড়া যাচ্ছে না ফলকের লেখা। কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেল, তাতে লেখা-‘উলসী-যদুনাথপুর বেতনা নদীর সংযোগ প্রকল্প। দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রম ভিত্তিক গণউপযোগ অনুগামী প্রকল্প বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে উদ্বোধন করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১ নভেম্বর ১৯৭৬।’
স্তম্ভের উলটো পিঠে আরেকটি ফলক রয়েছে। তাতে লেখা-‘আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার আমাদের দেশ গড়বার। স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক উলাসী-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের সঙ্গে যশোরবাসীদের প্রত্যয় প্রদীপ্ত করে গেলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, প্রেসিডেন্ট, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭।’
ফলকের লেখা পড়ে পাশ ঘুরে দেখি, একতলা পাকা ভবন এখন পরিত্যক্ত। জানালা-দরজা কিছুই নেই। পোকামাকড়ের ঘরবসতি। পাশে নতুন ভবনে চলছে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম। প্রাচীরের পূর্বপাশে উঁকি দিলে দেখা যায়, খালটি রয়েছে তবে মৃতপ্রায়। তলানিতে একটু পানি আছে।
৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে মাটি কেটে যশোরের শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ উলাসী-যদুনাথপুরে প্রায় চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খননে অংশ নেন সাধারণ মানুষ। ৬ মাসে খাল খনন সফল হয়। ৬ মাস পর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন উলাসী গ্রামের বাসিন্দা শতবর্ষী আবদুল বারিক মণ্ডল। সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে এসে স্কুল মাঠে নেমেছিলেন। হেঁটে এসে নিজে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়িতে দেন। সেই ঝুড়ি আমার ভাই করিম বকস মণ্ডল মেম্বরের মাথায় তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। আমার ভাইয়ের মাথার টোকা (মাথাল) রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে নেন। সেদিন খাল কাটা উদ্বোধনে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। পরে বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন খাল কাটার কাজে।
তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষ বিনা টাকায় খাল কাটার কাজে অংশ নেন। যারা কাজ করতেন, তাদের শুধু দুপুরে রুটি আর গুড় খাওয়ানো হতো। খালের পাড়ে অফিসের ওখানে রুটি তৈরি করা হতো। সেই রুটি খেয়েই সবাই মাটি কাটার কাজ করেছি। রাষ্ট্রপতিকে ভালোবেসেই মানুষ খাল কাটতে নেমে পড়েছিলেন।
আবদুল বারিক মণ্ডল বলেন, উত্তর শার্শার ৫টি বড় বিলের পানি ঠিকমতো সরত (নিষ্কাশন) না। এজন্য হাজার হাজার বিঘা জমিতে আবাদ হতো না। বেতনা নদীর পানি বের না হওয়ায় একটা আবাদ মার যেত। এলাকার মানুষের খুবই অভাব হতো। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর উলাসীতে বেতনা নদীর সঙ্গে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেন। তার সেই উদ্যোগে ঠিকমতো পানি সরা শুরু হলো। খালের পানি সেচের কাজে ব্যবহার করে আমরা উপকার পেতে শুরু করলাম। এ অঞ্চলে আবাদ ব্যাপক বৃদ্ধি পেল। আমাদের অভাব দূর হলো।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন খাল সংস্কার না হওয়ায় অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে গেছে। ফের খাল খনন করে পানি বের হওয়া সহজ করতে হবে। তাহলেই মানুষের উপকার হবে।
জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনীতে জনপ্রতিনিধি বাবার সঙ্গে গিয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সি আবু বক্কর সিদ্দিকী। বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সি আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, ‘আমার বাবা করিম বকস মণ্ডল ইউপি মেম্বর ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ঝুড়ি আমার বাবার মাথায় তুলে দিয়েছিলেন। বাবা প্রথম ঝুড়ি মাটি মাথায় করে ফেলেছিলেন। রাষ্ট্রপতি নিজেই মাটি কেটে খাল খনন উদ্বোধন করেছেন-এই বার্তাটি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য খাল খনন খুবই দরকারি ছিল।’
আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর যশোর সফরে এসেছিলেন। তখন তিনি এ অঞ্চলের মানুষের সার্বিক অবস্থার খোঁজ নেন। তখন জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা শার্শার মানুষের অভাব ও দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। তাদের কথা শুনে জিয়াউর রহমান জানতে চান, কী করলে মানুষের সচ্ছলতা ফিরবে। তখন বলা হয়, উত্তর শার্শার পাঁচটি বিলের ২২ হাজার একর জমি পানির নিচে থাকে। ওই বিলগুলোর পানি নিষ্কাশন হলে সব জমিতে চাষাবাদ হবে। ফসল হলে শার্শা থানা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। এই কথা শুনে জিয়াউর রহমান সাহেব খাল খননের উদ্যোগ নিলেন। নিজেই খাল খননের উদ্বোধন করেন। উলাসীর খাল খননের পর পাঁচ বিলের ২২ হাজার একর জমিতে ফসল হয়েছে। এছাড়াও খালের দুই পাশের জমি সেচের জন্য ২০টি সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়। তখন থেকেই এ অঞ্চলে ইরি (বোরো) ধানের আবাদ প্রচলন হয়। খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে মানুষ।’
শুধু আবদুল বারিক মণ্ডল কিংবা আবু বকর সিদ্দিকী নয়, তাদের মতো অনেকেই খাল খনন কর্মসূচির ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন। চোখের সামনেই ‘কৃষি বিপ্লব’ দেখেছেন।
উলাসী-যদুনাথপুর খাল খনন কর্মসূচি সফল হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সারা দেশে ব্যাপক খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেন। এই উদ্যোগ পরে ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে, যা গ্রামীণ উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং কৃষকদের জন্য সেচ ব্যবস্থা উন্নত করা। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী ও সাগরে চলে যেত, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমিতে পানির তীব্র সংকট দেখা দিত। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জিয়াউর রহমানের নন্দিত উদ্যোগ খাল খনন কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। জিয়ার ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে খাল খননে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু শ্রমজীবী নন, সব শ্রেণির মানুষ এ খনন কাজে অংশ নেন। খালটি কেবল পানি চলাচলের পথ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রাকৃতিক মৎস্য ভান্ডার। স্থানীয় জেলে ও ভূমিহীন কৃষকরা এখান থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। উদ্বোধনের ৬ মাস পর ফের উলাসীতে যান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। খাল খনন করায় বর্ষা মৌসুমে শার্শার পাঁচটি বিলের পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়। বিল এলাকার জমি আবাদের আওতায় আসে। একই সঙ্গে সেচ পাম্প বসিয়ে খালের পানি ব্যবহার করা হয়। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির আলোকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন। এটি তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৫০ বছর আগে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী-যদুনাথপুর খাল খননের মধ্য দিয়ে শুরু করেছিলেন। তার দেখানো পথেই হাঁটছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে প্রথম খাল খননে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাসী-যদুনাথপুর খালটি এলাকার মানুষের কাছে ‘জিয়া খাল’ নামেই বেশি পরিচিত। খালটি দীর্ঘদিনেও সংস্কার করা হয়নি। ফলে পলি জমে ভরাট হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। খালটি পুনঃখননের দাবি এলাকাবাসীর।
উলাসী গ্রামের বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খাল মরে গেছে। পুনরায় খাল কেটে সচল করতে হবে। তাহলে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছেন। তার বাবার খনন করা খালটি আবার সচল হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, উলাসীর খাল কাটার আগে এলাকার বিলের পানিতে ফসলের জমি ডুবে থাকত। জিয়াউর রহমান খাল কাটার পর সেই সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু অনেকদিন এই খালে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এখন ঠিকমতো পানি সরে না। খরার সময় খালে পানি থাকে না। খালটা ফের কাটলে এলাকার কৃষকদের উপকার হবে।
উলাসী গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, খাল খনন কাজ চলাকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খালের পাড়েই একটি সাধারণ ভবনে রাত্রিযাপন করেন। পরে ওই ভবনটি সরকারি কর্মকর্তাদের বৈঠক ও কৃষকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। কিন্তু সেই ভবনটি এখন পরিত্যক্ত। সময়ের বিবর্তনে ভবনের ভেতর থাকা শহীদ জিয়ার ব্যবহৃত ফ্যান, খাট, টেবিল, চেয়ারসহ মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন লুট হয়ে গেছে। সেখানে এখন শুধু পড়ে আছে ভাঙা দেওয়াল আর আগাছা।
তিনি বলেন, খালের পাড়ে নির্মিত ঐতিহাসিক ‘জিয়া মঞ্চ’ও আজ বিলুপ্তির পথে। যেখানে এক সময় উন্নয়নের শপথ নেওয়া হতো, সেই মঞ্চের একদিকে গড়ে তোলা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। অপরদিকে উলাশী ইউনিয়ন ভূমি অফিস।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, উলাসী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্ভে শেষে প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয়সহ নকশা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর টেন্ডার আহ্বান করা হবে।

