সরকারের প্রথম একনেক বৈঠকে উঠছে না
অনিশ্চয়তায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের দেওয়া ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি’ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেটি অনুমোদনের দায়িত্ব নেয়নি। এবার সব প্রস্তুতি শেষ হলেও ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন হচ্ছে না প্রকল্পটি। কবে নাগাদ অনুমোদন পেতে পারে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। এদিকে সোমবার অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আগামী একনেকের জন্য ১৭টি প্রকল্প চূড়ান্ত হলেও পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন তারেক রহমান।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানান, প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি হিসাবে গত সপ্তাহে পরিকল্পানা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আপাতত একনেকে উপস্থাপন না করতে পরামর্শ দেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সোমবারের বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। অন্য ১৭টি প্রকল্প উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এটি কবে নাগাদ একনেকে উঠতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে সোমবারের বৈঠকে অংশ নেওয়া পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, প্রধানত দুই কারণে এ মুহূর্তে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প একনেকে যাচ্ছে না। প্রথমত, চলমান সংকটের মধ্যে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে। দ্বিতীয়ত, প্রথম একনেক বৈঠক হওয়ায় এটি উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়াটা ঠিক হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। এসব কারণে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার পরও এই একনেক বৈঠকে উপস্থাপন হচ্ছে না। তবে কবে নাগাদ অনুমোদন পেতে পারে, সেটি বলতে পারছি না।
সূত্র জানায়, পদ্মা ব্যারাজ (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ করে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে। এর মাধ্যমে পদ্মানির্ভর এলাকার নদী সিস্টেমকে পুনরুজ্জীবিতকরণসহ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমানো, সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা কমানো এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৫টি নদী সিস্টেম (হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কমিয়ে স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা কমানো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার পানি নিষ্কাশন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
এদিকে প্রকল্পটি মোট ৫০ হাজার ৪৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি বা সমন্বয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি এবং ব্যয়বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ-পরবর্তী সংশ্লিষ্ট নদী সিস্টেম জলাধার থেকে পাওয়া প্রবাহের সঙ্গে হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যালভাবে ধীরে ধীরে অভিযোজিত হওয়ার কথা। ফলে খননসহ সংশ্লিষ্ট কাজগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এসব চিন্তা করে প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকল্পটি ২টি পর্যায়ে বিভক্ত করে বাস্তবায়নের জন্য পিইসি সভায় সুপারিশ করা হয়। প্রকল্পের ১ম পর্যায়ে ব্যারাজের মূল অবকাঠামো নির্মাণসহ হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেম ও গড়াই-মধুমতী নদী সিস্টেম পুনর্খনন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়নযোগ্য অতিরিক্ত বা সহায়ক অবকাঠামো এবং অবশিষ্ট নদী সিস্টেমগুলোর (চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী সিস্টেম) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া ১ম পর্যায়ে মূল ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে ২টি হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের সংস্থান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিনা জ্বালানিতে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে।
সরকারের প্রথম একনেকে উঠতে যাওয়া ১৭ প্রকল্প : করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প, এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এছাড়া সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যয় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অংশীদারত্বমূলক উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যয় ৫৯৫ কোটি টাকা। চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট, ৪ কোটি টাকা। আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন, ৬০ কোটি টাকা। শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে ৮ বিভাগীয় শহরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন, ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল উন্নয়ন, ১৩৯ কোটি টাকা। সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণ, ৬৪৯ কোটি টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আবাসিক নিবাস তৈরি, ৩০৯ কোটি টাকা। ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ, ৯২০ কোটি টাকা। সাভার সোনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সংকট নিরসনে ব্যারাক নির্মাণ, ৩৮৫ কোটি টাকা। বৈরাগীপুর-টুমচর-বাউফল জেলা সড়ক উন্নয়ন, ৩১৯ কোটি টাকা। বরিশাল-ভোলা-পিরোজপুর জেলা সড়কের বরিশাল থেকে ইলিশা ঘাট পর্যন্ত উন্নয়ন, ৫০২ কোটি টাকা। সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৫টি জেলায় জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্প, ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৯ কোটি টাকা।

