চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে অপেক্ষা বাড়ল আরও এক বছর
৯ বছরেও ৬ শতাংশ কাজ বাকি * দ্বিতীয় দিনের মতো ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরী
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ভারি বৃষ্টিতে বুধবার কোমরসমান পানিতে ডুবে যায় চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়। দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। জলাবদ্ধতা থেকে যেন মুক্তি নেই অধিবাসীদের -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলতি বছরেও শেষ হচ্ছে না। ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ৩৬ খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বর্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতে কাজ আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পিডি আহম্মদ মঈনুদ্দিন। এরই মধ্যে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা খরচ কমিয়ে তৃতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। এতে করে এবারের বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী। অপেক্ষা করতে হবে আরও এক বছর।
চউক সূত্র জানায়, নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি নিয়ে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। পরের বছর ২৮ এপ্রিল নগরীর চশমা খালের আবর্জনা অপসারণের মধ্য দিয়ে এটির কাজ শুরু করে চউক। প্রকল্পটির পূর্ত কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প সমাপ্তের সময় ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন শেষে প্রকল্প ব্যয় আরও ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে হয় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেওয়াল নির্মাণ, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ, ছয়টি রেগুলেটর নির্মাণ, ২৩ দশমিক ২০ কিলোমিটর নতুন নালা, ৩৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার খালের পাশে সড়ক নির্মাণ এবং ৯০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ। বর্তমানে এই প্রকল্পের ৯৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নগরীর হিজরা খাল ও জামালখান খালের সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে।
মঙ্গলবারের চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর হিজড়া ও জামালখান খালের আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কোমরসমান পানি উঠে যায় সড়কে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন সংস্থা জানিয়েছে, চলমান সংস্কার কাজের জন্য হিজড়া ও জামালখান খালের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে পানি নেমে যেতে পারেনি। বাঁধগুলো কেটে দেওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে পানি নেমে যায়।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পিডি আহম্মদ মঈনুদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা এখন হিজড়া খালের গাইড ওয়ালের কাজ করছিলাম। এ কারণে খালের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজনীয় পানি যাওয়ার জন্য পাইপও রয়েছে। কিন্তু আজকের (মঙ্গলবার) বৃষ্টি এত বেশি ছিল যে, পানি যেতে না পারায় মেহেদীবাগ, চকবাজার পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বাঁধ কেটে দেওয়ার পর পানি নেমে যায়। তবে কোথাও কোথাও নালা জ্যাম হয়ে যাওয়ায় পানি নামতে পারেনি। সেগুলো আমাদের আওতাধীন নয়।
তিনি আরও বলেন, এ বছর আর কাজ করা সম্ভব নয়। আমরা এক বছর এক্সটেনশন করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। আগামী অক্টোবর মাস থেকে কাজ শুরু করব। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও খরচ বাড়বে না। কানেকটিং ড্রেনসহ বিভিন্ন খাতে ৫০০ কোটি টাকা খরচ কমিয়ে আনা হবে।
নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে জানিয়ে প্রকল্পের পিডি বলেন, খালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা বেশকিছু বহুতল ভবন রয়েছে। এগুলো এখনো অপসারণ করা যায়নি। হিজড়া ও জামালখান খালের সংস্কারসহ সব মিলিয়ে ৬ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের মতো ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরী : মৌসুমের ভারি বৃষ্টিতে দ্বিতীয় দিনের মতো পানিতে ডুবেছে চট্টগ্রাম নগরী। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৪৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এদিন বেলা ১২ থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে নগরীর প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চকবাজার, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুরসহ বেশকিছু এলাকায় কোথাও কোমর পানি, কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও বুক সমান পানি জমে যায়। ফলে এসব এলাকায় যানবাহন চলাচলে এবং সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
এই দুর্ভোগের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বুধবার সকালে নগরীর প্রবর্তক মোড়সংলগ্ন এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চান। তিনি দাবি করেন, ২০১৬ সালে শেখ হাসিনা যে ভুল করে গেছেন, তার খেসারত দিচ্ছে চট্টগ্রামের নগরবাসী। জলাবদ্ধতার প্রকল্পটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (চসিক) না দিয়ে চসিককে দেওয়া হলে, এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না বলে জানিয়েছেন চসিক মেয়র।
এদিকে জলাবদ্ধ এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৬টি কুইক রেসপন্স টিম গঠন করেছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সেনাবাহিনীর এই ইঞ্জিনিয়ারিং কোর চট্টগ্রামে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ৩৬ খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পটির কাজ করছে। বুধবার প্রকল্পের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিন এ তথ্য জানিয়েছেন।
