Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

উচ্চ আদালতের আদেশ উপেক্ষিত

পাহাড় কাটা ও বালু লুট থামছে না

আলমগীর মিয়া

আলমগীর মিয়া

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড় কাটা ও বালু লুট থামছে না

পরিবেশ সুরক্ষায় উচ্চ আদালত থেকে একের পর এক নির্দেশনা দেওয়া হলেও অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটা থামছে না। গত দুই দশকে অন্তত অর্ধশত রিটের বিপরীতে রায় ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা, সমন্বয়হীনতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রভাবশালী চক্র প্রকাশ্যে এসব পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। রাঙামাটি, হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইকোর্টের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পাহাড় নিধন ও নদী বা কৃষিজমি থেকে বালু লুটের মহোৎসব চলছে। ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়লেও রায় বাস্তবায়নে শুধু কিছু মামলা ও লোক দেখানো জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে প্রশাসন।

পাহাড় কাটা, নদীদূষণ ও বালু উত্তোলন রোধে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতিসহ (বেলা) বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে। পাহাড় কাটা বন্ধ চেয়ে জনস্বার্থে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

এই আইনজীবী যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও সিলেট জেলায় পাহাড় কাটা বন্ধে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে হাইকোর্টে একাধিক আবেদন করা হয়।

আদালত পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, রায় অমান্য করে পাহাড়গুলো কেটে মাটি বিক্রি করছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ৪ ডিসেম্বর পাহাড় কেটে রাঙামাটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভবন নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অন্য যে কোনো পাহাড় কাটাও বন্ধ করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিট পিটিশনের শুনানি শেষে এই রায় দেন হাইকোর্ট। আদালত অন্তর্বর্তীকালীন এক আদেশে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), রাঙামাটি সদর উপজেলার ইউএনও এবং থানার ওসিকে আর কোনো পাহাড় যেন কাটতে না পারে সেই বিষয়ে মনিটরিং টিম গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। এ বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন এখনো হাইকোর্টে দাখিল হয়নি। হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগানগুলো থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে একটি রিট হয়। উপজেলার ইনাতাবাদ গ্রামের দুলাল মিয়া এ রিট করলে হাইকোর্ট অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে রুল জারি করেন। কিন্তু উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চা বাগানের ছড়া ও খোয়াই নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। এমন চিত্র চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

জানতে চাইলে চুনারুঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌফিক আনোয়ার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে চুনারুঘাটে ইজারাবহির্ভূত কোনো বালু উত্তোলন হচ্ছে না।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

১১ মে অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ট্রাক্টর জব্দ, বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম বিনষ্ট এবং এক ব্যক্তিকে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছে।

নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়নের ১৩৯ জন কৃষকের কয়েকশ বিঘা জমি থেকে স্থানীয় এক প্রভাবশালী অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এতে কৃষকরা জমি হারিয়ে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিষয়টি নিয়ে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৫ মে হাইকোর্ট বেঞ্চ নরসিংদীতে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে বালু উত্তোলন ৩ মাসের জন্য স্থগিত করেন। গত বছরের ১৮ মার্চ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে পাবনার পাকশী চ্যানেল পর্যন্ত পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। রিটকারী আইনজীবী হাবিব-উন-নবী রায় বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে বালুমহাল ইজারার ক্ষেত্রে অবশ্যই বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না যুগান্তরকে বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু দেশে নির্বিচারে পাহাড় নিধন ও বালু উত্তোলন চলছে। এতে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি পাহাড় ধসে প্রাণ হারান মানুষ। এজন্য পাহাড় রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম