Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণচুক্তির উদ্যোগ

আইএমএফের নজরে নবম পে-স্কেল বাজেট ও রাজস্ব

১২-১৬ জুলাই অর্থ বিভাগ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ম্যারাথন বৈঠক * আর্থিক সক্ষমতার খুঁটিনাটি যাচাই করা হবে

এম শাহজাহান

এম শাহজাহান

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আইএমএফের নজরে নবম পে-স্কেল বাজেট ও রাজস্ব

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৫০-৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এর আগে চলতি অর্থবছরের বাজেট, রাজস্বনীতি, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা বিশেষ করে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য চাচ্ছে সংস্থাটি। আইএমএফ মনে করছে, নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের জন্য শক্তিশালী নীতিগত অঙ্গীকার, সংস্কারে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ এবং পরিশোধ সক্ষমতার যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১২-১৬ জুলাই আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে। প্রথম বৈঠকে রাজস্বনীতি, বাজেট, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।

এরপর দ্বিতীয় বৈঠকের পুরো সময়জুড়ে থাকবে নবম পে-স্কেল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং এ খাতে চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন।

জুলাই থেকেই পে-স্কেল কার্যকর। এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নবম পে-স্কেলের অর্থায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। সরকারের আশা, এসব আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে নতুন পে-স্কেলের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এ অর্থ বাজেটের অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নবম পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। আগামী অর্থবছরের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এমন বাস্তবতায় আইএমএফ জানতে চাইছে, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান ধারা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া প্রবৃদ্ধির মধ্যে অতিরিক্ত এই ব্যয় অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে এবং সরকার তা কীভাবে মোকাবিলা করবে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজস্ব আহরণ। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অনেক কম। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে পে-স্কেলের মতো বড় ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়ে যাবে।

কয়েক বছর ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে-এ বিষয়টি আইএমএফের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে, বিনিয়োগে গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এমন অবস্থায় নতুন ব্যয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষ হতে হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর ঘোষণাও আইএমএফের আলোচ্য সূচিতে রয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সরকারি বেতন ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব কী হবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে প্রতিনিধি দল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার জন্য নয়, বরং রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি ভর্তুকি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত কর্মসূচি হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই রাজস্ব আহরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সমন্বয় থাকতে হবে। সরকারকে ব্যয়ের পাশাপাশি রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে। আইএমএফ হয়তো সেটিই দেখতে চাইছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ঋণ পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে আইএমএফের চাওয়া সংস্কার বাস্তবায়ন। কারণ রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির সফলতা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, আইএমএফ শুধু ঋণ দেয় না, অর্থনীতির সক্ষমতাও মূল্যায়ন করে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে একই সঙ্গে কর সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। অন্যথায় সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।

উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যমান ঋণচুক্তি থেকে সরে আসার পর বিএনপি সরকার নতুন তরে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের একটি নতুন প্যাকেজ চেয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব সংস্কার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেবে সরকার। ইতোমধ্যে আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর পর এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঋণের শর্ত ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফ প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .