Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

রক্তাক্ত জুলাই

বিচারের অপেক্ষায় শহীদ ছয় সাংবাদিকের স্ত্রী-সন্তানরা

আরমান ভূঁইয়া

আরমান ভূঁইয়া

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিচারের অপেক্ষায় শহীদ ছয় সাংবাদিকের স্ত্রী-সন্তানরা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও চরম অনিশ্চয়তার পরিবেশেও সাংবাদিকরা পিছপা হননি। জীবনের ঝুঁকি আর পরিবারের মায়া ত্যাগ করে তারা হয়ে উঠেছিলেন সত্যের প্রতীক। ভয়াল সেই দিনগুলোয় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন ছয় সাংবাদিক। এই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের হত্যার বিচার এখনো দৃশ্যমান হয়নি। রাষ্ট্র তাদের পাঁচজনকে ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, মিলেছে সরকারি সহায়তা। তবে তাদের স্বজনদের কাছে স্বীকৃতি বা অনুদানের চেয়ে ন্যায়বিচারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছয় সাংবাদিকের কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কেউ ছিলেন সদ্যজাত সন্তানের বাবা, আবার কেউ নতুন সংসার শুরু করেছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন শোক, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভার। কারও সন্তান এখনো বাবার ছবি বুকে নিয়ে ঘুমায়, কারও বৃদ্ধা মা বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

বাবার ছবি বুকে নিয়েই ঘুমায় আনিশা

জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ সাংবাদিকদের একজন ঢাকা টাইমসের সংবাদকর্মী হাসান মেহেদী। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। সেই সময় তার ছোট মেয়ে আনিশার বয়স ছিল সাত মাস। বড় মেয়ের তিন বছর। 

স্বামীকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েরা এখনো তাদের বাবাকে খোঁজে। ছোট মেয়েটা বাবার ছবি বুকে নিয়েই ঘুমায়। সন্তানরা আজও বাবার জন্য কাঁদে।’ হাসান মেহেদীর বাবা প্রবীণ সাংবাদিক এইচএম মোশাররফ হোসেন এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এরই মধ্যে তিনি একাধিকবার স্ট্রোক করেছেন।

সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার আর্থিক সহায়তা পেলেও পরিবারটির দাবি, কোনো অর্থই একজন স্বামী, বাবা বা সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। মামলার অগ্রগতি নিয়েও হতাশ তারা। তাদের চাওয়া-দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। 

স্বপ্ন হারিয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় বৃদ্ধ বাবা-মা

১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন ভোরের আওয়াজের রিপোর্টার শাকিল হোসেন পারভেজ। তিনি ছিলেন মা-বাবার একমাত্র ছেলে এবং তিন বোনের একমাত্র ভাই।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শাকিলের মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি বাবা মো. বেলায়েত হোসেন ও মা রাশেদা বেগম। বৃদ্ধ বাবা বলেন, ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয় ওকে (শাকিল) দেখলাম। ওর মাও প্রায়ই ছেলেকে স্বপ্ন দেখে কাঁদতে কাঁদতে জেগে ওঠে।’

এই হত্যার ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা করেন বাবা বেলায়েত। তিনি বলেন, মামলার কী অবস্থা, জানি না। পুলিশও কোনো আপডেট দেয় না। একটাই চাওয়া-শেষ বয়সে যেন বিচার দেখে মরতে পারি।

সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে শাকিলের পরিবার। 

বাবাকে খুঁজে ফেরে পদ্ম, বিচারের অপেক্ষায় মায়ের দীর্ঘশ্বাস

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন ছিল ১৯ জুলাই। এদিন রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সংবাদচিত্র ধারণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়। 

প্রিয়র মা শামসি আরা জামান বলেন, ‘ছবি তোলা ছিল ওর নেশা। আন্দোলনের ছবি তোলার কারণে ওকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’ 

প্রিয়র মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি কষ্টের ভার বহন করছে ছয় বছরের মেয়ে পদ্ম। তার দাদি শামসি বলেন, ‘কোনো বাবার কোলে শিশু দেখলে তাকিয়ে থাকে পদ্ম, চোখ ভিজে ওঠে। ক্যামেরা দেখলেই তার বাবার কথা মনে পড়ে। প্রায়ই প্রশ্ন করে-আমার প্রিয় বাবা কোথায়?’

মামলার তদন্ত নিয়ে হতাশা জানিয়ে শামসি বলেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। আমি শুধু ন্যায়বিচার দেখতে চাই।

নতুন জীবন শুরু হলেও শেষ হয়নি শোকের অধ্যায়

১৯ জুলাই সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় আন্দোলনের চিত্র ধারণের সময় গুলিতে শহীদ হন নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব (এটিএম তুরাব)। বিয়ের মাত্র দুই মাস ছয় দিনের মাথায় থেমে যায় এক নবদম্পতির স্বপ্ন।

তুরাবের স্ত্রী তানিয়া ইসলাম স্বামীর মৃত্যুর পর প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করেছেন। পরে পরিবারের সম্মতিতে গত মাসে নতুন সংসার শুরু করেন। 

এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন তার বৃদ্ধ মা। বয়স ও অসুস্থতায় ন্যুব্জ এই নারী প্রায়ই ছেলের কথা মনে করে কাঁদেন। তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ বলেন, ‘মা বারবার একটাই প্রশ্ন করেন, আমার ছেলের হত্যার বিচার কি হবে না?’

তুরাব হত্যার ঘটনায় করা মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছেন না স্বজনরা। তিনি বলেন, ‘তদন্তের জন্য কর্মকর্তারা এসে তথ্য নিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।’

শহীদ স্বীকৃতির অপেক্ষায় প্রদীপ কুমার ভৌমিকের পরিবার

জুলাই আন্দোলনে নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত প্রদীপ কুমার ভৌমিকের পরিবার। ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে প্রেস ক্লাবে গণপিটুনিতে তিনি মারা যান। দৈনিক খবরপত্রের উপজেলা প্রতিনিধি ও রায়গঞ্জ প্রেস ক্লাবের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি ‘জুলাই শহীদ’ স্বীকৃতি, পাননি সরকারি সহায়তাও। স্থানীয় চাপের মুখে মামলা পর্যন্ত করতে পারেনি পরিবারটি।

পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন প্রদীপ। তার মৃত্যুর পর আর্থিক ও মানসিক সংকটে পরিবারটি। ছোট ছেলে সুজন বাবার পথ অনুসরণ করে সাংবাদিকতা পেশায় এসেছেন, তিনি কালের কণ্ঠের রায়গঞ্জ প্রতিনিধি। সুজন অভিযোগ করে বলেন, মৃত্যুর পর আমার বাবাকে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ট্যাগ দেওয়া হয়। অথচ বাবা বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও রায়গঞ্জ উপজেলা সেক্রেটারি ছিলেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, তিনবার আবেদন করেও স্বীকৃতি মেলেনি। 

সরকারি সহায়তাও পায়নি পরিবারটি। দুই বছর পরও প্রদীপ কুমার ভৌমিকের পরিবার অপেক্ষা করছে রাষ্ট্র কবে একজন কর্তব্যরত সাংবাদিকের মৃত্যুকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে!

বাবার অপেক্ষায় তিন সন্তান, বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

৫ আগস্ট হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার সামনে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিতে শহীদ হন স্থানীয় লোকালয় বার্তার উপজেলা প্রতিনিধি সোহেল আখঞ্জী। এতদিন পরও এই সাংবাদিকের পরিবার জানে না মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে।

স্ত্রী মৌসুমি আক্তার তিন সন্তানকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন। সরকারি ও বিভিন্ন উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা পেলেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তার পিছু ছাড়ছে না। সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় ছোট মেয়ের কথা। বাবার মৃত্যুর অর্থ পুরোপুরি বুঝতে না পারা শিশুটি এখনো বিশ্বাস করে, তার বাবা বিদেশে গেছে, একদিন ফিরে আসবে।

বড় ছেলে ও মেজো মেয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবতা মেনে নিলেও বাবার স্মৃতি তাদের প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়ায়। মৌসুমি বলেন, ‘মামলার খবর আমাদের কেউ কয় না। আমরা শুধু শুনি তদন্ত চলতেছে।’

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন মৌসুমির সরকারের কাছে আবেদন-রাষ্ট্র যেন সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয় এবং তার একটি চাকরির ব্যবস্থা করে।

শহীদ ছয় সাংবাদিক হত্যা মামলা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান যুগান্তরকে বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়, এটিএম তুরাব এবং সোহেল আখঞ্জীর মামলা ট্রাইব্যুনালের তদন্তাধীন। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে বলা যাচ্ছে না। তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে কয়েকটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন শেষ হবে।

তিনি বলেন, সাংবাদিক হাসান মেহেদী ও শাকিল হোসেনের মামলা এখনো ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়নি; থানা পর্যায়ে সেগুলোর তদন্ত চলছে। পরে এসব মামলা ট্রাইব্যুনালে আসতে পারে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম