বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস আজ
হেপাটাইটিসে মৃত্যুতে শীর্ষ দশে বাংলাদেশ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি বাংলাদেশ। দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। এসব রোগের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে- অনেক ক্ষেত্রেই এটি কোনো উপগর্স ছাড়াই বছরের পর বছর শরীরে থেকে যায়। তাই উপসর্গের জন্য অপেক্ষা না করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের অবশ্যই স্ক্রিনিং করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, টিকাদান, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসাসেবা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে হেপাটাইটিসের নতুন সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব।
এমন বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সচেতনতা বাড়াতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস-২০২৬। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস : আসুন এর অবসান ঘটাই।’ প্রতিপাদ্যে সেবা প্রাপ্তির বাধা, কুসংস্কার ও ভুল তথ্য দূর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, বেশ কয়েক ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস আছে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ই ইত্যাদি। একেক ভাইরাস একেক ধরনের রোগের জন্য দায়ী। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস সি। এই রোগে ৬৯ শতাংশ মৃত্যু হয় ১০টি দেশে। এর মধ্যে আছে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম।
হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় সংক্রমিত রক্ত, অপরিষ্কার সুচ ও অরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং হেপাটাইটিস বি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য বলছে, দেশে ৮৫ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে পুরুষ ৫৭ লাখ, নারী ২৮ লাখ। ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রজননক্ষম ১৮ লাখ নারীর এই রোগ আছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশু চার লাখ। দেশের প্রায় ১৫ লাখ পরিবারে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ রয়েছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে টিকা দেওয়া সত্ত্বেও মাত্র ২৮ শতাংশের শরীরে পর্যাপ্ত সুরক্ষা রয়েছে। প্রতি ২০০ জনে একজন হেপাটাইটিস বি-পজিটিভ। তাই শুধু টিকার ওপর নির্ভর না করে সর্বজনীন স্ক্রিনিং জরুরি। আরেক গবেষণায় জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ হেপাটাইটিস এ-তে আক্রান্ত।
হেপাটোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি ও সি’জনিত লিভার সিরোসিস ও ক্যানসারে ১০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তবে রোগ দুটি পুরোপুরি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম এলিন বলেন, ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হেপাটাইটিস বি টিকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর দেশে সংক্রমণ হার ১৯৯৪ সালের ৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবুও দেশে এখনও প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদ আশরাফ সেতু বলেন, হেপাটাইটিস শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক বোঝা। দেশে চিকিৎসা খরচের বড় অংশই রোগীদের বহন করতে হয়। হেপাটাইটিস বি রোগীর আজীবন চিকিৎসা ও জটিলতার ব্যয় কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে তুলনামূলক অল্প খরচে টিকা ও সময়মতো পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, হেপাটাইটিস বি ও সি’র প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসা এখন দেশেই হচ্ছে। অন্য দেশের তুলনায় অনেক কম মূল্যে এসবের ওষুধ বাংলাদেশে সহজলভ্য। মিসর ও তাইওয়ানের সফলতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক (এনআইডি) স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করে সবাইকে পরীক্ষা করা এবং সংক্রমণমুক্ত ব্যক্তিদের টিকার আওতায় আনা গেলে ২০৩০ সালের আগেই বাংলাদেশকে হেপাটাইটিসমুক্ত করা সম্ভব।

