বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ
ভূমধ্যসাগর পাড়ির চেষ্টায় এগিয়ে বাংলাদেশিরা
৯৩ শতাংশ বন্দি ক্যাম্পে; ৭৯ শতাংশকে নির্যাতন * ছয় মাসে ইতালিতে ৪ হাজার জনের প্রবেশ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি, গ্রিসসহ ইউরোপের নানা দেশে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা এগিয়ে। ঝুঁকিপূর্ণ পথে এ যাত্রায় অনেকেই মুখোমুখি হচ্ছেন বন্দিত্বের; দিতে হচ্ছে বড় অঙ্কের মুক্তিপণও। কারও কারও প্রাণ যাচ্ছে উত্তাল সাগরে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণা দেখা যায়, এভাবে মানব পাচারের শিকার হয়ে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের ৯৩ শতাংশই বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে বন্দিত্বের মুখে পড়ছেন। ৭৯ শতাংশ জানাচ্ছেন নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা।
সাগরপথ পাড়ি দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে ভূমধ্যসাগরে। এ বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ১২ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ। লিবিয়ার তোবরুক থেকে ২১ মার্চ রওয়ানা হওয়া নৌকাটি দিক হারিয়ে ছয় দিন খাদ্য ও পানিশূন্য অবস্থায় ভেসে ছিল। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। মানব পাচারকারী চক্রের পাল্লায় পড়ে ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর পথে অনেক বাংলাদেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি বা গ্রিসে প্রবেশ করতে গিয়ে লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বাংলাদেশিদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় আটক হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে এভাবে লিবিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয়।
এ বাস্তবতায় আজ পালন করা হচ্ছে বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, নানাভাবে বাংলাদেশের নাগরিকরা মানব পাচারের শিকার হচ্ছেন। কয়েক বছর ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছে। এবার একইভাবে গ্রিসে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এগিয়ে বাংলাদেশ। এভাবে যাওয়ার পথে অনেক প্রাণহানি ঘটছে। পাশাপাশি লিবিয়ায় বহু মানুষ ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। বিদেশে কাজ বা শ্রম অভিবাসনের নামে এ মানব পাচার অত্যন্ত ভয়াবহ সমস্যা। পাচারকারীরা এখন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিন্তু সে তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে রয়েছে। আবার পাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোরও যথাযথ বিচার হচ্ছে না। পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।
ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা যায়, ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টায় বাংলাদেশিদের মধ্যে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা বেশি। যাত্রাপথের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা থেকে মিসর, দুবাই বা তুরস্ক হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ লিবিয়ায় গেছেন। চাকরির প্রলোভন দেখানো হলেও ৭৫ শতাংশ কোনো চাকরি বা কাজ পাননি। উলটো এসব বাংলাদেশিকে বন্দিদশায় থাকতে হয়েছে। এভাবে যারা বিদেশে গেছেন, তাদের মধ্যে ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে বন্দি ছিল এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর ৬৯ শতাংশ মুক্তভাবে চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছিল। তাদের অধিকাংশকে পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচার সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলাসহ ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টি মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ এসব মামলার তদন্ত করছে।
এতসবের মধ্যে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে নতুন সব পন্থায় মানব পাচার হচ্ছে। যার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গিয়ে সাইবার স্ক্যামের শিকার হচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমারে সংঘবদ্ধ মানব পাচারচক্র এর সঙ্গে জড়িত।
কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে থাকা কিছু এজেন্সি ও দালালচক্র নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা কারখানায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকায় বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদেরকে রুশ ভাষায় লেখা বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়। এরপর কয়েক সপ্তাহের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পোশাক কারখানা, গৃহকর্মী বা বিউটি পার্লারে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক নারীকে জোরপূর্বক ডান্স ক্লাব ও অনৈতিক কার্যকলাপে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের এভাবে পাঠানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে মিয়ানমারের বাসিন্দা রোহিঙ্গারাও। তথ্যনুসারে, ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল-চার বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ মানব পাচারের শিকার হয়েছেন। যাদের একটা বড় অংশ রোহিঙ্গা। এই পাচার অব্যাহত আছে এখনো।
তবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর মোট কতজন মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালানের শিকার হয়, এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। জানা যায়, প্রতিবছর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন জেলখানা বা বন্দিশালা থেকে ডিপোর্টি হিসাবে ফিরে থাকে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সময়ে এভাবে সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশে ফিরেছে।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কেউ কেউ পৌঁছে যাচ্ছেন গন্তব্যে। ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুসারে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা সবচেয়ে বেশি করেন বাংলাদেশিরা। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটি বলছে, এ পথ মধ্য-ভূমধ্যসাগর রুট হিসাবে পরিচিত। ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানায়, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৪ হাজার ২৪৯ বাংলাদেশি এভাবে ইতালিতে প্রবেশ করেন। একই সময়ে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে গেছেন ৩ হাজার ৬০৮ জন।

