Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

‘সিইপিএ’ চুক্তির দরকষাকষি সম্পন্ন

কোরিয়ার বাজারে খুলছে বাংলাদেশের নতুন দুয়ার

শুল্ক সুবিধা পাবে ৮৪২৮ পণ্য

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোরিয়ার বাজারে খুলছে বাংলাদেশের নতুন দুয়ার

সংগৃহীত ছবি

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (সিইপিএ) নেগোসিয়েশন বা দরকষাকষি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত সিইপিএ নেগোসিয়েশন কনক্লুশন সিরিমনিতে যৌথ ঘোষণা দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও।

প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমোদন শেষে চুক্তি কার্যকর হলে প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পাবে। মোট হিসাবে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য ও সেবা বিশেষ সুবিধা পাবে কোরিয়ার বাজারে। বিপরীতে বাংলাদেশের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের সুবিধা পাবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি শুধুই একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং এটি এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশলগত নিরাপত্তা। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় (গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন) বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি করবে। গতকালের অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রধান নেগোসিয়েটর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার পথ সহজ হবে : ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে স্বয়ংক্রিয় শুল্কমুক্ত সুবিধার বড় একটি অংশ হারাবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। এই বাস্তবতায় পৃথক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ সেই কৌশলের প্রথম বড় সাফল্য। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল বাজার পেলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, মাত্র ৫ মাসের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশের সঙ্গে উচ্চমানের এই নেগোসিয়েশন সম্পন্ন হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে রপ্তানি বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। সিইপিএ সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী হান-কু ইয়েও বলেন, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার ৫৬ বছরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অতীতে টেক্সটাইল ছিল সম্পর্কের মূল ভিত্তি। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্প সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ হবে দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার ও নতুন সরকারের উদ্যোগ কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।

কোন খাত লাভবান হবে : বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং হিমায়িত খাদ্য। চুক্তি কার্যকর হলে এসব খাত মূল্য প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও চামড়া পণ্যের উচ্চ চাহিদা রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে। দেশটিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ইতোমধ্যেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা ভোগ করছে। ভারত ও আসিয়ানভুক্ত কয়েকটি দেশও বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে বাজারে রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হওয়া মানে মূল্য প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের ভারসাম্য ফিরে পাওয়া।

বাড়বে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ : একই সঙ্গে সেবা বাণিজ্যে বাংলাদেশ ৯৫টি উপখাত উন্মুক্ত করবে। আর দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি উপখাতে বাজার খুলে দেবে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিক্ষা ও অন্যান্য পেশাগত খাতে সেবার সুযোগ বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ রয়েছে তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে। সিইপিএ কার্যকর হলে ইলেকট্রনিক্স সংযোজন, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক লজিস্টিকস এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিদেশি বিনিয়োগে। দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। চুক্তিটি কার্যকর হলে বাংলাদেশে কোরিয়ান বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর উপাদান, অটোমোবাইল ও অটো-পার্টস, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার জাহাজ নির্মাণ ও মেরিন শিল্প, আধুনিক কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগ মিলবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটাবে এবং দেশীয় শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৪৯১ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি করে প্রায় ৯০২ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে প্রায় ৪১১ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .