প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ‘আস্থা’ অর্জনের পরই: উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির
বাসস
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, তাড়াহুড়া করে নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, কূটনৈতিক আলোচনা ও সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ হলেই কেবল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর হতে পারে। আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দেশটিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ ও ঐকমত্য ছাড়া বাংলাদেশ এই মুহূর্তে তাড়াহুড়া না করার নীতি গ্রহণ করেছে।
গত সোমবার রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে বাসসকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) হুমায়ুন কবির এসব কথা বলেন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাটি এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, নতুন আন্তর্জাতিক জোটের সমীকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, মালয়েশিয়ায় বন্ধ শ্রমবাজার চালু এবং পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
ভারতে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রীর সফর সংক্রান্ত খবরকে জল্পনা উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এগুলো ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর। দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। দেড় হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে প্রতিবেশী দেশকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।
এই উপদেষ্টা বলেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ভারত কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে চায়, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে তাড়াহুড়া করে শীর্ষ সফর করার যুক্তি নেই। সুনির্দিষ্ট বিষয়ে উভয় দেশের ঐকমত্য এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ।’
হাসিনাকে স্পেস দেওয়া গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারপরিপন্থি : দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি শেখ হাসিনাকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা প্রচারমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়াকে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারপরিপন্থি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে কোনো অস্থিতিশীল তৎপরতা চালানো বা দণ্ডপ্রাপ্তকে স্পেস দেওয়া বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী দিল্লি এটিকে কোনোভাবেই যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারে না। এ বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে নয়াদিল্লির কাছে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশবিরোধী যে কোনো অপতৎপরতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।’
আঞ্চলিক জোট ও কৌশলগত ভারসাম্য : বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে সরকার। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনা করেই ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে গ্রীষ্মের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রীর রিয়াদ সফর চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসাবে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রে জনগণ পর্যায়ের যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি : এই উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন আমদানি ও বোয়িং বিমান কেনার আলোচনা এগোচ্ছে। পাশাপাশি ইইউর সঙ্গে ট্রেড অ্যান্ড পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের সুনির্দিষ্ট আলোচনা শুরু হয়েছে। আর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক চাপ এড়িয়ে চীনের সঙ্গে ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং কম্প্রিহেন্সিভ পার্টনারশিপের আওতায় বাংলাদেশকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চীনের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের বিষয়টি জোরালো আলোচনা চলছে।
আফ্রিকায় নতুন বাজার ও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রেসিডেন্সি নির্বাচনে আফ্রিকার ৫৪ দেশের ৫২টিই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে। একে কাজে লাগিয়ে খুব শিগগিরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আফ্রিকা সফর করবে বলে জানিয়েছেন এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের নতুন রপ্তানি বাজার গড়ে তুলতে সেখানে একাধিক চুক্তি সই হবে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা প্রসঙ্গে এই উপদেষ্টা বলেন, সফল আলোচনার ফলে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করেছে। খুব শিগগিরই জটিলতা কাটিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার পথ উন্মোচিত হবে।
জাতিসংঘে ঐতিহাসিক জয় ও রোহিঙ্গা সংকট নিরসন : সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় মূলত প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সরকারের ভাবমূর্তির বৈশ্বিক স্বীকৃতি উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, জাতিসংঘের এই প্রেসিডেন্সি প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমঞ্চে নীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির আদর্শ তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ তৈরি করে রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা জোরদার করা হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের গত ১৮০ দিনে একটি সুদৃঢ় পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
সিলেটের ওসমানীনগরের সন্তান হুমায়ুন কবিরের বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকের পর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই), ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লিডস ল’ স্কুল থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। তিনি তিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাকের সঙ্গে কাজ করেছেন।
