Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গ্রাম মুড়ারবন্দ

Icon

খন্দকার আলাউদ্দিন, চুনারুঘাট

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গ্রাম মুড়ারবন্দ

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মুড়ারবন্দ দরবার শরিফ -যুগান্তর

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক স্থান মুড়ারবন্দ দরবার শরিফ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে মুড়ারবন্দ গ্রামটি ‘১২০ আউলিয়ার মাজার’ হিসাবে পরিচিত।

ইসলামের প্রচার-প্রসার, মুসলিম আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের নানা স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা ধারণ করে আজও গ্রামটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ভক্ত, দর্শনার্থী ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

সবুজ প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত মুড়ারবন্দ দরবার শরিফে শায়িত আছেন সৈয়দ শাহ নাসির উদ্দিন সিপাহশালা (রহ.)। তিনি সিলেট বিজয়ী শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সঙ্গী ও মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তার জন্ম ইরাকের বাগদাদের এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় তার বংশধররা হজরত আলী (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে এটি ‘সিপাহশালার পূর্ব-পশ্চিম মাজার’ নামে পরিচিত। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ দরবার শরিফকে বাংলায় ইসলাম প্রচার এবং তরফ অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মারক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

সূত্র অনুযায়ী, ১৩০৩ থেকে ১৩১৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে সিপাহশালার সৈয়দ শাহ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর নেতৃত্বে তৎকালীন তরফ রাজ্য বিজয় হয়। বর্তমান হবিগঞ্জের চুনারুঘাটসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা সেসময় তরফ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিজয়ের পর তিনি খোয়াই নদীঘেঁষা মুড়ারবন্দে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং এখান থেকেই ইসলামের শিক্ষা, মানবতা, ন্যায়বিচার ও আধ্যাত্মিক জীবনচর্চার প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন।

ইতিহাসবেত্তাদের মতে, সৈয়দ শাহ নাসির উদ্দিন (রহ.) দিল্লির সুলতানের সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করে ধীরে ধীরে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। ১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দে শাহজালাল (রহ.)-এর নির্দেশে তিনি তরফ অভিযানে অংশ নেন এবং তৎকালীন শাসক আচানক নারায়ণকে পরাজিত করে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

তরফ বিজয়ের মাধ্যমে শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়, এ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। জনশ্রুতি রয়েছে, তার সঙ্গে আগত বারোজন আউলিয়া তরফের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে ইসলাম প্রচার করেন। এ কারণেই একসময় তরফ অঞ্চল ‘বারো আউলিয়ার মুলুক’ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক আউলিয়ার আগমন ঘটে।

মুড়ারবন্দ দরবার শরিফের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সিপাহশালারের মাজারের অবস্থান। স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে তিনি পূর্ব-পশ্চিমমুখী করে দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে প্রচলিত নিয়মে তাকে উত্তর-দক্ষিণমুখী করে দাফন করা হলেও পরবর্তী সময়ে অলৌকিকভাবে কবর পূর্ব-পশ্চিমমুখী হয়ে যায়। এই বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে ভক্তদের কাছে আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে এ বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ সীমিত।

প্রায় আট শতক ধরে মুড়ারবন্দ দরবার শরিফ ধর্মপ্রাণ মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। দরবার শরিফে প্রতি বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ এখানে জিয়ারত, ইবাদত ও দোয়ার উদ্দেশ্যে আসেন। প্রতিবছর ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী উরস মহফিলে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। দেশ-বিদেশের ভক্তরাও এতে অংশ নেন।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাজারকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যক্তি গাঁজাসেবন, মাদক পাচার, গানের আসর ও অন্যান্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তারা এসব অপতৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দরবার শরিফের ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন নিদর্শন ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করার দাবি জানান। তাছাড়া মাজারের দানবাক্সের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার দাবি তুলেছেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .