Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

রংপুর মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস

ঘুস-দুর্নীতির ‘স্বর্গরাজ্য’ অনিয়মের মহোৎসব

Icon

মাহবুব রহমান, রংপুর

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুস-দুর্নীতির ‘স্বর্গরাজ্য’ অনিয়মের মহোৎসব

রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ঘুস ও দুর্নীতির ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। টাকা দিলেই মিলছে সব রকমের অনুমোদন। কী নেই এই অনুমোদনের তালিকায়? অবৈধ নিয়োগ, নিয়োগ বোর্ড গঠন, অনুমোদনহীন পদের অনুমোদন। ব্যানবেইজসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক ফাইল জালিয়াতি ও অসঙ্গতিপূর্ণ থাকায় কয়েক বছর ধরে বাতিল করে ফেলে রাখা হয়েছে। চাহিদামতো উৎকোচ দিলে বাতিল হওয়া সেসব ফাইলের অনুমোদনও দেওয়া হয়। এ যেন এক ঘুস বাণিজ্যের মহোৎসব চলছে রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে। টাকা না দিলে ফাইল পড়ে থাকে অনুমোদনের অপেক্ষায়। উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত এই ঘুস বাণিজ্য যেন এখানে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি এমন অনিয়ম ও ঘুস গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে। বিভিন্ন নথিপত্রে দেখা গেছে, অনেক পুরোনো ফাইলপত্র পড়ে ছিল। এমপিওর জন্য আবেদন করেও অনুমোদন মেলেনি নানা অসঙ্গতি ও জালিয়াতি করে উপস্থাপন করায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যানবেইজে নাম না থাকা, জাল এনটিআরসিএ সনদ, অস্তিত্বহীন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও ভুয়া নিয়োগ বোর্ডের রেজুলেশন, অনুমোদনহীন পদ, প্যাটার্নবহির্ভূত নিয়োগ কিংবা এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে এই ফাইল দীর্ঘদিন অনুমোদন না পাওয়ায় পড়ে ছিল। অবশেষে ফাইলটি বিপুল অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে পুনরায় আমলে নিয়ে রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে অনুমোদন দিয়েছে। তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ঢাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যারা এই সুবিধা নিয়েছেন তারা জানিয়েছেন, ফাইলের নথিপত্রের অসঙ্গতি ও জাল কাগজপত্রের ধরন অনুযায়ী কোনো পদের জন্য ৭ লাখ, আবার কোনো পদের জন্য ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। ওই সূত্র জানায়, এমন ঘটনা শতাধিক পদের ক্ষেত্রে হয়েছে রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের আওতাধীন জেলাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এমন ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথিপত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরের অন্তত ১০টি কলেজের একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও নিয়ে এমন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ হাট ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক (তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকায় প্রথম পাতায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখানো হলেও প্রকৃত পক্ষে জালিয়াতি করে দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। একই বছরের ১৭ এপ্রিল নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত দেখানো হয়েছে, সেটিও ভুয়া ছিল। এতে চাকরিপ্রার্থী ফৌজিয়া আক্তার সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন দেখিয়ে ২৬ এপ্রিল নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। ৩ মে তিনি যোগদান করেন। নিয়োগ বোর্ডে বিশেষজ্ঞ হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক পার্থ বিপ্লব রায় উপস্থিত ছিলেন দেখানো হলেও ওই অধ্যাপক জানিয়েছেন, নিয়োগ বোর্ডে তার স্বাক্ষর জাল করে দেখানো হয়েছে। এটি তিনি জানেন না।

ফৌজিয়া আক্তার ২০১৫ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে বিএ অনার্স পাশ করেন। ২০১৯ সালে ইউজিসির অনুমোদনবিহীন ‘রয়েল ইউনিভার্সিটি’ থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স পাশ দেখান। তার নামে এনটিআরসিএ’র কোনো সনদ নেই এবং ব্যানবেইজেও নাম ছিল না।

রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ওমর ফারুক এবং পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল মতিন লস্কর ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অন্তত ১০ বার ফাইলটি এমপিও’র জন্য বাতিল করেন। অথচ রংপুর আঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের সদ্য বিদায়ি পরিচালক আমীর আলী ও তৎকালীন উপপরিচালক আনোয়ার পারভেজ চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল ফৌজিয়া আক্তারের নামে এমপিওভুক্তির অনুমোদন দেন। বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা শুরু হলে দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাদাকাত হোসেন ফাইলটির অনুমোদন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠান। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে, কলেজের অধ্যক্ষ আবুজার রহমান বলেন, কীভাবে এই নিয়োগ হয়েছে, কারা জড়িত আমি জানি না। ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। এ বিষয়ে অভিযোগের জবাবে পরিচালক আমীর আলী ও তৎকালীন উপপরিচালক আনোয়ার পারভেজ বলেন, ফাইল বিভিন্ন টেবিল ঘুরে যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আসে তখন ধরেই নিতে হয় সবকিছু ঠিক আছে। তাই সেভাবে অনুমোদনের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর বাইরে কিছু হলে তা বোঝার উপায় নেই।

রংপুরের কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগে (ডিগ্রি শাখায়) তৃতীয় পদে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর দৈনিক ইনকিলাব ও রংপুরের দৈনিক আখিরা পত্রিকায় প্রকাশিত দেখানো হলেও তা ছিল জালিয়াতি করে প্রস্তুত করা। তৎকালীন অধ্যক্ষ মোফাজ্জল হোসেন এই নিয়োগ দেখিয়ে এমপিও’র আবেদন করেন। ওই ডিগ্রি কলেজের ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ বোর্ড গঠন করে, বোর্ডে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসাবে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির নাম ও স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন ডিও লেটারে থাকা টিপু মুনশির স্বাক্ষরের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।

ডিজির প্রতিনিধি হিসাবে কারমাইকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. দীপকেন্দ্র নাথ দাসের স্বাক্ষর দেখানো হলেও তিনি এই নিয়োগের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .