Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

লোডশেডিংয়ে কুয়াকাটার পর্যটনে ধস

জেনারেটরে পুড়ছে লাভের টাকা, হতাশ ব্যবসায়ীরা

Icon

আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জেনারেটরে পুড়ছে লাভের টাকা, হতাশ ব্যবসায়ীরা

পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম খান। সমুদ্রসৈকতের খুব কাছেই ‘খান প্যালেস’ নামে একটি আবাসিক হোটেল রয়েছে তার। চলতি বর্ষা মৌসুমে পর্যটকের খুব একটা ভিড় না থাকলেও কমেনি তার হোটেল পরিচালনার ব্যয়। কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত কতশত খরচ। কিন্তু এ বছর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে তার ব্যবসার বারোটা বেজেছে। জেনারেটরের জ্বালানি কিনতেই বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে। ব্যবসায় লাভের স্বপ্ন এখানেই থমকে গেছে।

রহিম খান যুগান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকা অবস্থায় পুরো হোটেলে যদি মাত্র একজন গেস্টও থাকে, তার জন্যও চালাতে হয় জেনারেটর। আর এখন তো দিনের মধ্যে ৫-৬ ঘণ্টাই থাকে না বিদ্যুৎ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবারের আগের সপ্তাহে সাত দিনে জেনারেটরের তেল কেনা বাবদ তার খরচ হয়েছে ৫৪ হাজার টাকা। মাসের হিসাব ধরলে এই ব্যয় দাঁড়ায় সোয়া দুই লাখ টাকারও বেশি। এই অবস্থা চলতে থাকলে কীভাবে ব্যবসা করব-প্রশ্ন তার।

কেবল রহিম খান নন, পুরো পর্যটনকেন্দ্রজুড়ে হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীদের এখন একই হাহাকার-বিদ্যুতের লোডশেডিং। দিন-রাত মিলিয়ে কখনো কখনো ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুতের দেখা মেলে না বিশ্বখ্যাত এই পর্যটনকেন্দ্রে।

কুয়াকাটার প্রসিদ্ধ পর্যটন প্রতিষ্ঠান সিকদার রিসোর্টের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. শাহিন আলম বলেন, ‘আমাদের এখানে ছোট-বড় দুটি জেনারেটর রয়েছে। জেনারেটর দুটি চালাতে ঘণ্টায় প্রায় দেড়শ লিটার ডিজেল লাগে। বৃহস্পতিবারের আগের সাত দিনে ২৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। সেই হিসাবে লোডশেডিংয়ের কারণে এক সপ্তাহে জেনারেটরের জ্বালানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।’ সাগরপারের আরেক প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্ট পার্কের মালিক সৈয়দ মো. ফারুক বলেন, ‘পুরো ব্যবসা শেষ করে দিচ্ছে লোডশেডিং। আমার হোটেলে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার ডিজেল লাগছে জেনারেটর চালাতে। এমনিতেই বর্ষা মৌসুমে হোটেলে গেস্ট কম। তারপরও যদি জেনারেটরের জ্বালানিতে মাসে চার লাখ টাকার বেশি খরচ হয় তাহলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখব কী করে।’

লোডশেডিংয়ের কারণে বড় হোটেল রিসোর্টের পাশাপাশি কুয়াকাটার ছোট ব্যবসায়ীদেরও করুণদশা। জিরো পয়েন্টের পশ্চিম দিকে সাগরপারে ছয় কক্ষের একটি ছোট্ট গেস্ট হাউজ চালান এ এইচ এম আজাদ। লোডশেডিংয়ের ছোবল এখানেও। গেস্ট হাউজের ম্যানেজার সোহাগ বলেন, ‘দিনে-রাতে ৭-৮ বার জেনারেটর চালাতে হয়। সবমিলিয়ে দৈনিক প্রায় হাজার টাকার ডিজেল খরচ করতে হয়।’

সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন সরোয়ার প্যারাডাইস হোটেলের মালিক হাসান ইমান বলেন, ‘একদিনে যদি ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে ২০ লিটার ডিজেল খরচ হয়। তার মানে মাসে ৬শ লিটার। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’

এদিকে ভয়াবহ এই লোডশেডিংয়ের কারণে কর্মচারীদের বেতনেও পড়েছে টান। হোটেল মালিকরা তাদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন সি ভিউ হোটেলের মালিক মাসুম হায়দার বলেন, লোডশেডিং সবকিছু শেষ করে দিচ্ছে। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটায় চারশর বেশি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। কেবল দেশি নয়, বহু বিদেশি পর্যটকও আসেন এখানে। তীব্র সংকটের মধ্যেই শিল্প-কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে সরকারের। সেক্ষেত্রে পর্যটনকেন্দ্রের প্রতি এই অবহেলা কেন? এখন তো আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানালেন, এখানে যেসব হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে তার বেশির ভাগ ব্যাংকঋণ নিয়ে করা। লাভ-লোকসান যাই হোক, ঋণের কিস্তি মাফ নেই। বিদ্যুতের যে অবস্থা তাতে ঘরবাড়ি বিক্রি করে কিস্তি দিতে হবে মালিকদের।’

বিদ্যুৎ সরবরাহ আর লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে পল্লী বিদ্যুতের কুয়াকাটা জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, ‘পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে সাড়ে ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড থেকে পাচ্ছি না আমরা। এ কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লেই কেবল লোডশেডিং কমবে। তার পরামর্শ, বিষয়টি নিয়ে পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবসায়ীরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম