শিক্ষাক্রমে ব্যাপক সংস্কার আনা হচ্ছে: মাহ্দী আমিন
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জিপিএ-৫-এর কৃত্রিম বন্যা বন্ধ করে মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে দেশের শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের শিক্ষাক্রমে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার আনা হবে। এর প্রথম ধাপ হিসাবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই পাঠ্যক্রমে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি ও খেলাধুলা সম্পর্কিত নতুন বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।
রোববার বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলার পাশাপাশি সরকারের শিক্ষাকাঠামোর ভবিষ্যৎ রূপরেখা, শিক্ষাক্রম সংস্কার, শিক্ষক মূল্যায়ন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন, শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় এবং ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান।
মাহ্দী আমিন বলেন, ‘২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কার আনা হবে। এতে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে একটি টেকসই ও যুগান্তকারী শিক্ষাক্রমের রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব হবে।’
উপদেষ্টা জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বই ও বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এসব বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের গুণগত পরিবর্তন এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী আমলে পরিসংখ্যান ভালো দেখানোর জন্য কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫-এর বন্যা ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এমনকি পরীক্ষা না দিয়েও পাস করিয়ে দেওয়ার কালচার (সংস্কৃতি) ছিল। আমরা সেই আত্মঘাতী পথ বন্ধ করেছি। এবার কোনো গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা শতভাগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের জিপিএ ও জেনুইন (সঠিক) ফল পেয়েছে।’
সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য কিংবা শিক্ষা স্রোতোধারা থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র বোঝা হিসাবে দেখবে না বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার এসব অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে নিয়ে ভাবেনি। কিন্তু আমরা তাদের জন্য বিশেষ পলিসি তৈরি করছি। এসব তরুণকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি), স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ভোকেশনাল কোর্সে যুক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাদের উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।’
বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারের নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, কর্মসংস্থানের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র চালু করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে আলোচনা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে স্থানীয় কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীরা তাদের দক্ষতার বিবরণ দিয়ে নিবন্ধন করতে পারবে। ফলে চাকরিদাতা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।
শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ট্যাবলেট পৌঁছে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং বিশ্বমানের র্যাংকিংয়ে অগ্রগতি অর্জনের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, স্থানীয় শিল্পের সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ব্রেন ড্রেন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিদ্যালয়গুলোর বৈষম্য দূর করার বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ ও শহরের বিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য কমাতে দেশব্যাপী ‘প্রাইমারি স্কুল গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘ইনোভেশন ও স্টার্টআপ কম্পিটিশন’-এর মতো জাতীয় প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের তুলে ধরার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
