Logo
Logo
×
   

সাহিত্য সাময়িকী

গল্প

এসেছিলে তবু আসো নাই

Icon

আনোয়ারুল হক

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এসেছিলে তবু আসো নাই

প্রেমের বিয়ে হোক অথবা পারিবারিকভাবে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন হোক, বিয়েশাদিকে কেউ কেউ ভাগ্য বলে। ভালো হলে তো হলো, যদি না হয়, তাহলে অন্যকথা। নিজে নিমিত্ত হলে ভাগ্যকে দোষ দেওয়া ছাড়া গত্যান্তর থাকে না। আর পারিবারিকভাবে হলে অবধারিত দোষ পড়ে বাবা-মায়ের ওপর। ধর্মবক্তারা বলেন, পূর্বনির্ধারিত। বলেন, তুমি খারাপ হলে তোমার জন্য খারাপ অপেক্ষা করছে। ভালো হলে ভালো। এবার তুমি প্রেম করো আর নির্বাচিত, যাই হোক না কেন, তবে বিষয়টি গোলমেলে। বহুবিবাহিতের সম্পর্কে তারা কিছু বলেন না। নিজেকে দিয়েও আমি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারি না।

আমি বিয়ে করেছি নিজের ইচ্ছায়। ফলে কখনো কখনো নিজেকেই দোষ দিই। আর আমার ছোটভাই বিয়ে করছে বাবা-মায়ের নির্বাচিত পাত্রীকে। ফলে ওর বৌ নিয়ে কথা উঠলে দোষ দেয় বাবা-মাকে। পরোক্ষে ভাগ্যকে। সবশেষে মনে করি, ভাগ্যই হবে। তা না হলে গালিব কেন বলবেন, হাতের রেখায় ভাগ্য খুঁজো না গালিব, যার হাত নেই, তারও ভাগ্য আছে।

আমার ছোটভাই, চার ভাইয়ের মধ্যে মেজ ইমতিয়াজ আহমেদ সফল ব্যবসায়ী। ডিওএইচএসে বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকে। দুই ছেলেমেয়ে। ছোট মেয়ে মান্যতার বিয়ে হয়েছে তিন বছর হলো। ওর বর কানাডা প্রবাসী। বড় ভাই আজমের বিয়েতে এসেছে দিন সাতেক হলো। বিয়ের দুদিন পর চলে যাবে। মুখ দেখলে বোঝা যায়, চেহারায় আনন্দ কম। বাবা-মায়েরও। ভাগ্য কিনা কে জানে, বড়ভাই আজম ছয় বছর ধরে প্রেম করে যে মেয়েকে বিয়ে করেছে, সে-ও কানাডা প্রবাসী। আজকাল এমন বিয়ে আকছার হচ্ছে। বেশিরভাগ ছেলেই মেয়ের ওপর ভর করে বিদেশে পাড়ি জমায়। আজমের মনোভাব এমনই। যদিও সে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত। ছেলের এ সিদ্ধান্তে কেউ খুশি নয়। এদিকে বিয়ের আয়োজনে কমতি নেই। তবুও অস্বস্তিটা এখানে।

ছেলের পক্ষে কি সম্ভব হবে প্রবাসে চাইলেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়া? এ দুশ্চিন্তা বাবা-মাকে খুশি হতে দেয় না।

কনের নাম সুমনা। তার বাবা-মা কাছের আত্মীয়স্বজন ঢাকা-কুমিল্লাতে বসবাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শামসুল হক ওর বাবা। তিনি কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে। সঙ্গে মেয়ের মাও ছিল। এক ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে বড় সুমনার জন্ম সেখানে। তিন বছর পর দেশে ফেরার সময় নিঃসন্তান খালু-খালার কাছে সুমনাকে রেখে এসেছিলেন। সেখানেই মেয়ের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, সবশেষে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি। নিজের পায়ে দাঁড়ানো স্বাধীন মেয়ে। ওসব দেশে যেমন হয়। এ সুমনার সঙ্গে আজমের ফেসবুকে পরিচয় এবং ছ’বছর ধরে প্রেম।

আর ইমতিয়াজের একমাত্র ছেলে আজম সামরিক বাহিনীতে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা। বাবা-মায়ের ইচ্ছা নয়, ছেলে হাতছাড়া হোক। ভেবেছিল, প্রতিষ্ঠিত ছেলেকে বিয়ে দিয়ে নিজেদের কাছে রাখবেন অথবা থাকবে। সে আশায় গুড়েবালি। জেনেছে, কানাডা প্রবাসী মেয়ে ছেলেকে আগেই শর্ত দিয়ে রেখেছে, বিয়ের পর ছেলেকে কানাডায় চলে আসতে হবে, সে বাংলাদেশে যাবে না। প্রেম এক্ষেত্রে জয়ী হয়েছে। আজম এ শর্ত মেনে বাবা-মাকে চাপ দিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। বলেছে, দরকার হলে চাকরি ছেড়ে দেবে। সমস্যা কী! সে খুব খুশি।

এতসব আমি জানতাম না। জেনেছি পরে। আমার আরেক ছোটভাই তাজুলের কাছে। ইমতিয়াজ ফোন করে বিয়ের দাওয়াত দেওয়ার সময় সে আমাকে তাদের মনের কষ্ট খুলে বলেনি। আমি খুশি মনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে দাওয়াত কবুল করেছি। ইমতিয়াজ তার মনের কষ্টের কথাটা বলেছে ওর ইমিডিয়েট বড়, আমার ছোট তাজুলের কাছে। শুনে আমিও বিমূঢ় হয়েছি। পালটা ফোন করে জিজ্ঞেস করে ইমতিয়াজকে বিব্রত করিনি।

আকদ্ হয়ে গেছে দুদিন আগে। আজ ঘরোয়া আয়োজনের বৌভাত। ইমতিয়াজ বলেছে, কনেপক্ষের আত্মীয়স্বজন ঢাকা ও কুমিল্লায় যারা থাকে, তাদের মধ্য থেকে খুব কাছের আত্মীয়দের আজকের দাওয়াতে বলা হয়েছে। কোন কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠানটি হতে পারত। কিন্তু দুপক্ষের ইচ্ছাতে ইমতিয়াজের বাসায় হচ্ছে। তারপরও অতিথি সমাগম কম মনে হচ্ছে না। ওপরে-নিচে মিলিয়ে পাঁচটি বেডরুম আর বিশাল ড্রইংরুমের পুরো বাড়িটি হাসি-আনন্দ আর কথার ফুলঝুরিতে ঝলমল, গমগম করছে।

আমি বয়স্ক মানুষ। আমাকে ড্রইংরুমে এসে সোফায় বসতে দেখে আশপাশে ছেলেমেয়ে মহিলারা যারা ছিল, তারা সবাই একে একে উঠে ভেতরের দিকে অথবা নিচতলায় চলে গেল। নিরিবিলি হলাম বলে আমারও আরাম হলো।

ভাবলাম, আমাদের সবারই দিনরাত খুব দ্রুত সরে যাচ্ছে পেছনের দিকে। আমাদের ভাইবোনের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এটাই শেষ বিয়ে। কোলাহল শুনতে শুনতে আমি আপন মনে বিয়েবাড়ির উত্তাপ অনুভব করছিলাম। ভালো লাগছে। ইমতিয়াজের বৌ, ভাতিজি মান্যতা আর জামাই সাকিল সবাই একবার করে এসে আমার খবর নিয়ে গেছে। আমি বলেছি,

-তোমরা কনের বাড়ির লোকজনের দিকে মনোযোগ দাও। আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আমি ঠিক আছি। খাওয়ার সময় হলে আমাকে ডাক দিও।

সত্যি কথা, আজকাল রাজনীতির আলাপ, বেহুদা আড্ডা আমি এড়িয়ে চলি। তেতাল্লিশ বছরের অধ্যাপনা জীবন শেষ করেছি। এখন অবসর সময়ে লেখালেখি করে সময় আমার ভালোই কেটে যায়। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ঝাড়া হাত-পা। পালা করে আমরা দুজনে নাতি-নাতনিদের মায়ায় বছরজুড়ে ওদের কাছে থাকি। যখন যেখানে খুশি, দুজনে চলে যাই। আজ গিন্নি আসেনি। সে গেছে যশোরে বড় মেয়ে নাতি-নাতনির কাছে বেড়াতে।

আমি আপন মনে মুখ নিচু করে ডান হাতের তালুতে ভাগ্য রেখার ওপর আঙুল রেখে হয়তো কিছু ভাবছিলাম। হয়তো ভাবছিলাম না কিছুই। এলামেলো। আনমনা ছিলাম। ইতোমধ্যে কখন যে তিনি সামনে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করিনি। আমার মগ্নতা ভাঙল নারী কণ্ঠের কোমলতায়,

-দেখুন তো, আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি কিন্তু জেনেই আপনার সামনে এসেছি!

ঝকঝকে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ানো নারীকে ছাপিয়ে এক ঝটকায় আমার চোখের সামনে এসে দাঁড়াল একটি কিশোরী। আমার সামনে যিনি, তিনি আজ কমপক্ষে ষাটোর্ধ্ব একজন সুন্দরী মহিলা। পেশায় ডাক্তার। আমি তাকে চিনেছি। জেনেছি আগেই কথায় কথায়, তিনি কনের খালাত বোন। বিয়েতে আসবে ভাবিনি। তখন তার মুখের আদল যেমন ছিল আজকের এ পরিণত বয়সে শরীরের গঠন বদলালেও কিশোরী মুখের আদল একটুও বদলায়নি। প্রায় একই আছে।

তাকে যে আমি চিনেছি স্বীকার করলাম না। ভেতরে ভেতরে ভীষণ চমকে গেলেও নিজেকে দমিয়ে রেখে বললাম,

-চিনতে পারিনি তো! কে আপনি?

আমার প্রশ্নটা অনাগ্রহের। শোনার সঙ্গে সঙ্গে নারীর ব্যক্তিত্বে বুঝি ঘা লাগল। চোখ জোড়া দপ্ করে জ্বলে উঠল। জ্বালাটা

প্রকাশ পেল ছোট্ট একটি শব্দের জবাবে,

-মিথ্যুক।

বলেই ঝট করে পেছন ফিরে ড্রইংরুম ছেড়ে ঘরের মাঝখানে কোলাহলে চোখের আড়াল হয়ে গেল নারী।

সামনে থেকে দ্রুত সরে যাওয়া এ নারীর নাম তাসনুভা। ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের নামকরা একজন অধ্যাপকের মেয়ে।

তখন সে কিশোরী। কুমিল্লা ফয়জুন্নেসা স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। একদিন সকাল দশটায় স্কুলে যাওয়া পথে হঠাৎ দেখেছি তাকে। মোহে অথবা প্রেমে পড়ে গেলাম কিশোরী মেয়েটির। আমি তখন উঠতি যুবক। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে বাংলা অনার্সে পড়ি। কবিতা, গান, নাটক এসব নিয়ে ঘরছাড়া সময়ের এক দুরন্ত যুবক। সকাল-বিকাল আড্ডা দিতে আসি সহপাঠী বন্ধু শওকতের ঝাউতলার বাসায়।

মেয়েটি আসত পুলিশ লাইনের দিক থেকে। রিকশায় সকাল-বিকাল নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে যেত আবার বিকালে একই পথে ফিরত। দিনের পর দিন কী এক দুর্বার আকর্ষণে শওকতের বাসার সামনে তেমাথার মোড়ে সকাল-বিকাল দুইবেলা দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি।

যেমন মেয়েরা জেনে যায়, তেমনি একদিন মেয়েটিও জেনেছে, আমি কেন রোজ তেমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। সেটা প্রকাশ পেয়েছে চোখে চোখ পড়লেই তার শরীরী ভাষায়। দুজনের প্রতিদিন দেখা হয়েছে, কিন্তু বলা হয়নি আমার কোনোদিন, ভালোবাসি।

যে বছর বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হলেন, তার পরের বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করতে চলে যাই আমি। আর দেখা হয়নি কোনোদিন। আজকের আগে আমি ভেবেছি, ভুলে গেছি। তা বুঝি কোন ফেলে আসা বইয়ের পৃষ্ঠার মতো। আসলে ভুল ভেবেছি, কোন কোন পৃষ্ঠার কবিতা মনে থাকে। তাসনুভার সঙ্গে দেখা হওয়াটাও সেই কবিতার মতো।

বিয়েবাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বের হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি আর কোথাও তাকে দেখিনি। খাওয়ার টেবিলেও দেখিনি। ভেবেছি, চলে গেছে।

লিফটে নেমে গাড়ি বারান্দায় একা তাসনুভাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি অবাক। ফাঁকি দেওয়া গেল না। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,

-তুমি? আমি তো ভেবেছিলাম চলে গেছো বুঝি! যাহোক-

তাসনুভা কিছু বলছে না। সোজা তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে। বললাম,

এতগুলো বছর পর তোমার সঙ্গে আমার দেখা না হলেই বোধহয় ভালো ছিল!

-কেন? ওর প্রশ্নে ঝাঁজ। বললাম,

-মাটির যত গভীরে যাবে, ততই জল পাবে, ওটা বেদনার।

কিছু না বলে ড্রাইভিং সিটে বসে তাসনুভা আমার মুখের ওপর চোখ রেখে গাড়িটা চালু করল। বলল,

-আমি জেনেই এসেছি, আমাদের দেখা হবে। আর-

কথাটা শেষ করেনি সে। ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে হলো, তার চোখের ভাষা বলেছিল এমন,

-এসেছিলে তবু আসো নাই জানিয়ে দিলাম।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .