কাফরুলে যুবদল কর্মী হত্যা
পাঁচ লাখ টাকায় চুক্তি, চার শুটারসহ গ্রেফতার ৮
ব্রাজিলের খেলার দিন হত্যার চেষ্টা ভেস্তে যায় * ভুয়া নাম ঠিকানায় হোটেলে অবস্থান
নিহত ইউসুফ আলী পারভেজ। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাফরুলে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ হত্যার ঘটনায় চার শুটারসহ এ পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার পর্যন্ত গ্রেফতারদের মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ ৫ জন ও কাফরুল থানা পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতার করে। কিলারদের সঙ্গে ৫ লাখ টাকার চুক্তি হলেও পরিশোধ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। ডিবি ও থানা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে আজ ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
কাফরুল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, শুটার চঞ্চলসহ মোট ৩ জনকে গ্রেফতারের তথ্য তিনি জানেন। ঘটনার দিন শুক্রবার চঞ্চল এবং রোববার জিহাদ ও মাসুম নামে আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে জিহাদ মামলার এজহারভুক্ত আসামি ও মাসুমের নাম তদন্তে এসেছে। আর কারও গ্রেফতারের বিষয়টি তার জানা নেই।
এদিকে, ডিবির একটি সূত্র জানায়, তারা শনিবার ৪ জন ও রোববার ১ জনকে গ্রেফতার করেছে। রাতের মধ্যে কিলারদের ভাড়া করা হাফিজুর রহমান হাফিজ ও পলাতক হাসানকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। দুটি মামলার মধ্যে ডিবি হত্যাকাণ্ডের ও থানা পুলিশ অস্ত্র আইনের মামলা তদন্ত করছে। তবে থানা পুলিশের দুজনকেও ডিবি জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এছাড়া অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে থাকা চঞ্চলকেও হত্যাকাণ্ডের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাবে।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, গ্রেফতার জিয়ারুল মোল্লা ওরফে রাজু প্রায় ৯ বছর কাফরুল এলাকায় ছিল। সেখানে সে শ্রমিক লীগের নেতা ছিল। এলাকায় থাকার ফলে স্থানীয়দের সঙ্গে তার বেশ সখ্যতা ও জানাশোনা রয়েছে। তাই এলাকা পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য কিলারদের কয়েকজনকে তার সঙ্গে দেওয়া হয়। সূত্র আরও জানায়, মূলত উদ্দেশ্য ছিল যুবদলের কাফরুল থানার সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে শুট করা। তবে তারা অপরিচিত হওয়ায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। বিষয়টি বাবুরও নজরে পড়ে। তখন ইউসুফ তাদের কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে পিস্তল বের করে গুলি করে। এরপর পাঁচজনই ফাঁকা গুলি করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে গুলির একপর্যায়ে শুটার চঞ্চলের বন্দুক লক হয়ে গেলে স্থানীয়দের হাতে সে ধরা পরে। অন্যরা দুই-তিন রাউন্ড গুলি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, হত্যাকাণ্ডের পর মিরপুর-১ নম্বরে তারা জড়ো হয়। সেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের হাফিজুর রহমান হাফিজ তাদের সঙ্গে যোগ দেন। তারা একটা অটোরিকশায় ওঠে। জিয়ারুলের কাছে যে পিস্তলটি ছিল সেটি হাফিজ নিয়ে নিয়ে নেয়। পরে তাদের দ্রুত ঢাকা ছাড়তে বলা হয়। এরপর তারা গাবতলী গিয়ে বাসে করে মাগুরায় চলে যায়। সেখান থেকে জিয়া আর হাসান দুজন একসঙ্গে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যায়।
ডিবি জানায়, আগেই থেকে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে জিয়াকে ধরতে পারলেও হাসান পালিয়ে যায়। এছাড়া আলী হোসেনকেও ধরা হয়। এই আলী হোসেন হলো জিয়ার আত্মীয়। তিনি হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিলেন না, তবে ঘটনার পরে শুটাররা তার কাছে থেকেই সব খবর নিতে থাকেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৬ জুলাইও একটি গ্যারেজে যুবদল নেতা বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন হাফিজ। তিনি দুটি পিস্তল এনেও কিলারদের দিয়েছিলেন। তবে ওইদিন ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা থাকায় এবং একটি পিস্তলের গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে শুক্রবার হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া চার শুটারকে ঘটনার আগে ‘হোটেল প্রাইম’-এ এনে রাখা হয়। হোটেলের খাতায় ৩ জনের নাম লেখা থাকলেও রুমে ৪ জন অবস্থান করেন। পরবর্তীতে চঞ্চল এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সেখানেই হত্যার পরিকল্পনা ও স্থান নির্ধারণ করা হয়। হোটেলের মালিক সুমন আহমেদ জানিয়েছেন, ২৩ জুলাই দুপুরে ওই যুবকরা হোটেলে আসেন। তারা নিজেদের যশোরের সিটি কলেজপাড়া থেকে চাকরির সন্ধানে এসেছেন বলে জানান। তিনজনই আলাদা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জমা দেন। এনআইডি অনুযায়ী তাদের পরিচয় ছিল, মাহাদী হাসান রিয়াদ, তানভির ইসলাম মোমিন ও সাইফুল ইসলাম ইমন। পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার পর তারা ৯ তলার ৯০৩ নম্বর রুমে ওঠেন। হোটেল মালিকের ধারণা, তারা যে এনআইডি কার্ডগুলো জমা দিয়েছিল, সেগুলো ভুয়া ছিল।
ডিবি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাকিব খান যুগান্তরকে জানান, থানা ও ডিবি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামি গ্রেফতারে চেষ্টা চালায়। ঘটনার সঙ্গে রাজনীতি নয়, স্থানীয় দখল, আধিপত্য ইত্যাদি সম্পৃক্ত। যেহেতু ঘটনাটা ঘটছে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যে, একটি গোষ্ঠী রাজনীতিকে টেনে এনে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। তবে ঘটনার সঙ্গে যেই সম্পৃক্ত হোক গ্রেফতার করা হবে।

