নিউমার্কেট এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি
আধিপত্য যার ফুটপাতে চাঁদার সাম্রাজ্য তার
৫ আগস্টের পর থেকেই কোটি টাকার ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব * মঙ্গলবারের সংঘর্ষে ছাত্রদল-যুবদলের ১০ নেতা বহিষ্কার
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার ফুটপাতে প্রায় পাঁচ হাজার দোকান রয়েছে। এসব এলাকার আধিপত্য যার থাকে ফুটপাতের কোটি টাকা চাঁদা তার অনুকূলে চলে যায়। গত কয়েক যুগ ধরে এভাবেই চাঁদাবাজি হয়ে আসছে। দোকানপ্রতি দৈনিক চাঁদা, ‘ভাড়া’, বিদ্যুৎ বিল এবং নতুন করে বসার জন্য এককালীন অগ্রিমের নামে চলে বিপুল অর্থের লেনদেন। এই নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, কে কত টাকা তুলবে আর সেই টাকা কারা ভাগ করে নেবে-এসব নিয়েই একাধিক পক্ষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও নিউমার্কেট থানা যুবদলের সংঘর্ষের নেপথ্যে ছিল এই আধিপত্য ও চাঁদাবাজি। সংঘর্ষের ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দশ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নিউমার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব যুগান্তরকে বলেন, তারা নিজেরা বসে সমস্যার সমাধান করবে বলে জানতে পেরেছি।
নিউমার্কেট এলাকার চাঁদাবাজির বিষয়ে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এগুলো চলে আসছে। বাধা দিলে পুলিশই এখানে থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, ফুটপাতে দোকান বসা বন্ধ হলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ চাঁদাবাজির নেপথ্যে সরকারি দলের লোকজন জড়িত।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সায়েন্স ল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, গাউছিয়া, নীলক্ষেত মোড়, নিউমার্কেটের ১ থেকে ৪ নম্বর গেট, নিউমার্কেটের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশ, কাঁচাবাজার, ঢাকা কলেজ পেট্রোলপাম্প এলাকা, বাবুপুরাসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ‘ভাড়া’ তোলা হয়। এর বাইরে বিদ্যুৎ বিল হিসাবে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই এই চাঁদাবাজি চলছে। কোটি টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে।
দোকানিদের অভিযোগ-ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদার ভাগ নেন। বিভিন্ন পক্ষের ‘লাইনম্যান’রা বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চাঁদা তোলেন। বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও চাঁদাবাজি চলেছে। নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রায় পাঁচ হাজার দোকান থেকে চার-পাঁচটি ভাগে প্রতিদিন ২৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, অন্তত দুটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। নিউমার্কেট থানার ওসি (অপারেশন) খাইরুল বাশার জানান, কেউ থানায় অভিযোগ করে না, তাই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
চাঁদা তোলা নিয়েই সংঘর্ষ, ১০ নেতা বহিষ্কার
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের অভিযোগ, নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্য সচিব কেএম চঞ্চলের অনুসারী মো. সোহেল ও আজিম ওরফে ‘গুন্ডা আজিম’ বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতের দোকান ও ভ্যানগাড়ি থেকে চাঁদা তুলতে যান। এ নিয়েই মঙ্গলবার সংঘর্ষ হয়। তবে ছাত্রদলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে নিউমার্কেট থানা যুবদল।
সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের অন্তর্গত নিউমার্কেট ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের পাঁচ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন, নিউমার্কেট থানার সদস্য সচিব কেএম চঞ্চল, যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব, ১৮নং ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব শাহাদাত এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার ও সুমন (চায়না সুমন)। এছাড়া ঢাকা কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুলহাস আহমেদসহ ছাত্রদলের পাঁচ নেতা বহিষ্কার হয়েছেন। অন্যরা হলেন-যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন শিকদার, প্রিন্স খন্দকার, সদস্য সাগর খান ও মির্জা গোলাম রায়হান। আরেক বিজ্ঞপ্তিতে নিউমার্কেট থানা যুবদলের আহ্বায়ক মিজান ব্যাপারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
