Logo
Logo
×
   

দ্বিতীয় সংস্করণ

উপাচার্যদের সংলাপে অর্থমন্ত্রী

কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে উচ্চশিক্ষাকে যুক্ত করার আহ্বান

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নতুন বিভাগ ও বিষয় চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সুপারিশ না করতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।

শুক্রবার সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুদিনব্যাপী উপাচার্যদের সংলাপের প্রথম দিন উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক, ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজসহ বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ইউজিসির সদস্য এবং উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঞ্চালনায় প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে। শুধু সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলাও উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বা নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সুপারিশ করা উচিত নয়।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, শিক্ষার মান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফলও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের গবেষণা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনের বিষয়গুলো শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণায় বেসরকারি খাতের অর্থায়ন বাড়ানো এবং গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে তাদের এগিয়ে আসতে হবে। গবেষণা যেন শুধু প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে-এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন বিষয়বস্তু যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। আর্থসামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।

দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের উপযোগী স্নাতক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ভাষা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি, সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা জোরদার, ইন্টার্নশিপ এবং হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

উপদেষ্টা মাহ্দী আমীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট-টাইম জব ও ক্যারিয়ার সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে নিয়মিত চাকরি মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে বিনামূল্যে চাকরির মেলা করতে প্রস্তুত। সেখানে বাড়তি কোনো খরচের প্রয়োজন নেই; কেবল সুযোগ ও সংযোগ তৈরি করে দিলে নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটবে। জীবনবৃত্তান্ত তৈরি থেকে শুরু করে ইন্টারভিউ প্রস্তুতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া, এটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক দায়িত্বের একটি অংশ।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা শেষ করেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে নিয়োগদাতারাও প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল পাচ্ছেন না। এ ব্যবধান কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। উচ্চশিক্ষার টেকসই রূপান্তরের লক্ষ্যে ইউজিসি পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

দুদিনব্যাপী এ সংলাপে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশাসন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্প খাতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। প্রথম দিনে চারটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব, অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুনসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .