Logo
Logo
×
   

সুস্থ থাকুন

ডেঙ্গু জ্বর

আতঙ্ক নয় সচেতনতাই সুরক্ষা

Icon

ডা. মারুফ রায়হান খান

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন; কেউ সহজেই সুস্থ হয়ে ওঠেন, আবার কারও ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েন। তাই ডেঙ্গু সম্পর্কে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো : আতঙ্কিত না হয়ে রোগটিকে সঠিকভাবে চেনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

* ডেঙ্গু কী

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত এডিস aedes aegypti মশার মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর মশাটি অন্য মানুষকে কামড়ালে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। দিনের বেলাতে এ মশা কামড়াতে পারে। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা যায় না। ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ হলো হঠাৎ জ্বর। এর সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব কিংবা ত্বকে র‌্যাশ থাকতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত প্রথম দিনেই তীব্র জ্বর চলে আসে। এ জ্বর টানা জ্বর বা কন্টিনিউয়াস ফিভার হয়ে থাকে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে- ডেঙ্গুর তীব্রতা শুধু জ্বরের মাত্রা দিয়ে বোঝা যায় না।

যে কোনো ভাইরাস জ্বরে মাথাব্যথা হতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এক ধরনের বিশেষ মাথাব্যথা হয়। তীব্র মাথাব্যথার সঙ্গে রেট্রোঅরবিটাল পেইন থাকে। অর্থাৎ চোখের পেছনে ব্যথা। চোখ ডানে-বামে যখন নাড়াতে যায়, তখন চোখে ব্যথা হয়। সব ডেঙ্গু রোগীর এটি হয় না।

যে কোনো ভাইরাস জ্বরেই শরীর ব্যথা হতে পারে। তবে ডেঙ্গু জ্বরে এত বেশি ব্যথা হতে পারে যে, এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রেকবোন ফিভার’। সাধারণত এ ব্যথাটা মাংসপেশিতে হয়। গিরায় বা জয়েন্টে না।

* ডেঙ্গুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কখন

ডেঙ্গুতে অনেক সময় একটি ভুল ধারণার কারণে কেউ কেউ বিপদে পড়েন। জ্বর কমে গেলে মনে করেন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন। বাস্তবে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার সময়টিই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। জ্বর সাধারণত কয়েকদিন থাকার পর কমতে শুরু করে। এ সময় কিছু রোগীর শরীরের রক্তনালির ভেতর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ফলে রক্তচাপ কমে শক, শ্বাসকষ্ট, পেটে পানি জমা, রক্তক্ষরণ বা অন্যান্য অঙ্গের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

* কোন লক্ষণগুলো বিপদের সংকেত

ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিচের যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি-

▶ প্রচণ্ড বা ক্রমাগত পেটব্যথা

▶ বারবার বমি

▶ মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া

▶ বমি বা মলের সঙ্গে রক্ত

▶ অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা বা অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব

▶ শ্বাসকষ্ট

▶ প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া

▶ ত্বক ফ্যাকাশে, ঠান্ডা বা স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া

▶ মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ভীষণ সতর্ক হতে হবে।

* ডেঙ্গুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কোন পরীক্ষা করতে হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে জ্বরের কততম দিনে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার ওপর। জ্বরের শুরুর দিকে সাধারণত NS1 antigen পরীক্ষা করা হয়। যেখানে সুবিধা আছে, RT-PCR বা অন্যান্য molecular test-ও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে NS1 negative মানেই ডেঙ্গু নেই, বিষয়টি এমন নয়। বিশেষ করে রোগের শুরুর দিকে এটি নেগেটিভ আসতে পারে; তাই রোগীর উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল কন্ডিশনের সঙ্গে রিপোর্ট সমন্বয় করে দেখতে হবে। জ্বর কয়েক দিন পার হলে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হওয়ায় Dengue IgM পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ে। অন্যদিকে CBC ডেঙ্গু শনাক্ত করার পরীক্ষা নয়, তবে platelet count, white blood cell count ও hematocrit-এর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও চিকিৎসক প্রয়োজনানুসারে অন্যান্য পরীক্ষা করাতে পারেন।

* প্লেটলেট কমলেই কি বিপদ

ডেঙ্গু নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, প্লেটলেট কমলেই মনে করেন রোগী বিপজ্জনক অবস্থায় চলে গেছে। এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমতে পারে এবং রোগের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসাবেও তা দেখা যায়। কিন্তু রোগীর অবস্থা বোঝার জন্য শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখলে হবে না। রক্তচাপ, পালস, প্রস্রাবের পরিমাণ, শ্বাসকষ্ট আছে কি না, হেমাটোক্রিটের পরিবর্তন, রক্তক্ষরণ এবং রোগীর সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল অবস্থাসহ সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।

* ডেঙ্গু হলে কী করবেন

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। অধিকাংশ রোগীর চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা। জ্বর ও ব্যথার জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। তবে নিজের ইচ্ছায় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ibuprofen, diclofenac, naproxen বা অন্যান্য NSAID জাতীয় ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। তাই সাধারণ ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই। অনেক সময় জ্বর কয়েকদিন স্থায়ী হলেই মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দেন। এটি ঠিক নয়। অন্য কোনো bacterial infection-এর প্রমাণ বা চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।

পানি, ওরস্যালাইন, লেবুর শরবত, ফলের রস, স্যুপ বা অন্যান্য উপযুক্ত তরল গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত পানি বা স্যালাইন পান করানোও সবসময় ভালো নয়। বিশেষ করে হৃদরোগ, কিডনি রোগ বা শ্বাসকষ্টের রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তরল ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই রোগীর অবস্থা অনুযায়ী তরলের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।

* কখন হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে

সব ডেঙ্গু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। অনেক রোগী বাড়িতেই পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে উপরে বর্ণিত বিপদ সংকেতের যে কোনো একটি দেখা দিলে, রোগী তরল গ্রহণ করতে না পারলে, উল্লেখযোগ্য রক্তক্ষরণ হলে, শ্বাসকষ্ট বা শকের লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।

* দ্বিতীয়বার কী ডেঙ্গু হয়

অবশ্যই হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক সেরোটাইপ রয়েছে। একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়া সম্ভব। দ্বিতীয় সংক্রমণে কিছু মানুষের মারাত্মক ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

* প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী

ডেঙ্গুর চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মশার বিস্তার বন্ধ করা। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের কাপ বা বোতল, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ বা বারান্দায় জমে থাকা পানি, এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই হবে না, পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ পাশের বাড়িতে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন হলে তার প্রভাব পুরো এলাকার মানুষের ওপর পড়তে পারে।

দিনের বেলাতেও মশা থেকে সুরক্ষিত থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা নিরোধক ব্যবহার করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করাও জরুরি।

লেখক : হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .