Logo
Logo
×
   

সুরঞ্জনা

নারীর সুহৃদ জাপানের হিরাসাওয়া সোনো

Icon

লুবনা আহমেদ

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নারীর সুহৃদ জাপানের হিরাসাওয়া সোনো

জন্মভূমি জাপান ছেড়ে হিরাসাওয়া সোনোর ঠিকানা এখন বাংলাদেশ। যেন বাংলার রূপে মজেছেন এ নারী। সঙ্গে বাঙালি নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত। অনেক প্রতিভার অধিকারী হিরাসাওয়া সোনো। একাধারে ডাক্তার, ফ্যাশন ডিজাইনার, বিউটিশিয়ান-সবকিছুতেই তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এতসব প্রতিভার অধিকারী হয়েও কীভাবে মানুষের সেবা করা যায়, তা নিয়ে ভাবেন সব সময়। মানবসেবার চিন্তা থেকেই তার হৃদয়টা যেন পাখি হয়ে ওঠে। তাই কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করার পর ছুটে এলেন বাংলাদেশে। করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশে এসে অসহায় মানুষের দুর্দশা দেখে মনস্থির করলেন, এ দেশেই নতুন স্বপ্নের বীজ বুনবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য কীভাবে কাজ করা যায় এ নিয়ে ভাবলেন কিছুদিন। ভাবনা শেষে প্রসারিত করলেন সাহায্যের হাত। কোনো নারী যেন টাকার অভাবে সংসার চালাতে বা সন্তানের খাবার জোগাড় করতে ব্যর্থ না হন, সে চিন্তা থেকে সোনো শুরু করলেন তার নতুন যাত্রা।

করোনাকালীন বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখার পর তিনি চারদিকের বাস্তবতা উপলব্ধি করলেন কিছুটা। এ দেশে মুষ্টিমেয় মানুষ অনেক টাকার মালিক; কিন্তু তারা অসহায়দের খুব একটা সাহায্য করেন না। অথচ বড় বড় ক্লাবে এন্তার টাকা খরচ করে সময় কাটান তারা। অসহায় নারীদের নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের নেই। কারও কারও এমন মানসিকতায় খুব কষ্ট পান সোনো। সে সময় তিনি মনস্থির করলেন, সমাজে নারীদের প্রতিষ্ঠিত করতে একটা কাজের জায়গা করে দেবেন নিজ দায়িত্বে। তাই প্রতিষ্ঠা করলেন একটি ফুডকোর্ট। ২০২৪ সালের ৩০ জুন গড়ে তুললেন ‘টোকিওডাঙ্গো’ নামের এ জাপানিজ ফুডকোর্ট। কাজের মাধ্যম হিসাবে খাবারের দোকান বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, তিনি এ দেশে এসে বুঝতে পারেন, বাঙালি ভীষণ ভোজনরসিক। আমাদের দেশে এখন ফুডকোর্ট এবং স্ট্রিটফুড বিভিন্ন এলাকার কম-বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব ফুডকোর্ট ও স্ট্রিটফুডে মজাদার সব খাবার পাওয়া যাচ্ছে হাতের কাছেই। ভোজনরসিক বাঙালি অবসরে বা ছুটির দিনগুলোতে বন্ধু অথবা পরিবার নিয়ে ছুটে আসেন এসব খাবার দোকানে। তাই সোনো খাবার দোকানকেই বেছে নিলেন তার কাজের মাধ্যম হিসাবে। বাঙালির স্বাদ এবং সাধ্যের বিষয়টা মাথায় রেখে গড়ে তুললেন নিজের একটি প্রতিষ্ঠান। তার খাবার দোকানে খেতে খুব বেশি টাকা খরচ করতে হয় না। অল্প খরচে চোখের সামনে খাবারগুলো তৈরি হয় বলে খেয়েও তৃপ্তি পান সবাই। ছোট পরিসরে সাজানো-গোছানো ছিমছাম পরিবেশে খাবার খেতে ক্ষণিকের জন্য হলেও ব্যস্ত জীবনে খানিকটা প্রশান্তি মেলে।

জাপানিজ ফুড এখন সারা বিশ্বে জনপ্রিয় খাবার। হিরাসাওয়া সোনোর প্রতিষ্ঠিত টোকিওডাঙ্গোতে আট পদের জাপানিজ খাবার পাওয়া যায়। সর্বনিম্ন ১০০ টাকায়ও মেলে খাবার। এসব খাবারের মধ্যে টোকিওডাঙ্গো, টোকিও গেওজা চিকেন, টোকিও টাকোয়াকি, টোকিও শ্রিম্প অন্যতম। এ ছাড়া বিভিন্ন মজাদার ড্রিংকও আছে সোনোর খাবারের দোকানে। জাপানিরা সাধারণত দীর্ঘজীবী হয়। এর একটি প্রধান কারণ হলো তারা মসলাজাতীয় খাবার খান না। তাদের খাবারের মেনুতে থাকে স্টিমজাতীয় খাবার। আর এসব খাবার খেলে খুব সহজেই পেট ভরে যায়। স্টিমজাতীয় খাবার সহজে হজমও হয়। পাশাপাশি এসব খাবার ওজন কমাতেও সহায়তা করে থাকে। মানুষ এখন স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সচেতন। কী কী খাবার খেলে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হবে না, এসব বিবেচনা করেই মানুষ খাবার খেয়ে থাকেন।

মোট ৬টি ব্রাঞ্চ আছে সোনোর টোকিও ডাঙ্গোর। গুলশান, নারায়ণগঞ্জ, যমুনা ফিউচার পার্ক, ১০০ ফিট, মিরপুর এবং উত্তরায়ও কিছু দিনের মধ্যে আরেকটি ব্রাঞ্চ চালু হতে যাচ্ছে। একের পর এক শাখা চালুর পাশাপাশি সোনো বাংলাদেশের নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতেও নিয়েছেন বিশেষ উদ্যোগ। মূলত এ দেশের মেয়েদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের স্বাবলম্বী করে তুলতেই তার এ যাত্রা শুরু থেকে চলমান। টোকিও ডাঙ্গোতে যারা কাজ করেন, সবাইকে তিনি নিজ হাতে কাজ শিখিয়ে কাজের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি নিজেই তাদের ট্রেনিং দিয়ে থাকেন। এ প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিংয়ের জন্য দিতে হয় না কোনো ফি। বিনামূল্যেই মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান। জাপানি খাবার তৈরি করতে সময় তুলনামূলক কম লাগে। তাই অনেক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীরাও এসে ট্রেনিং নিয়ে থাকেন সোনোর কাছ থেকে। হাসি মুখে সবাইকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যান হিরাসাওয়া সোনো। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই দোকান দিতে পারেন যে কোনো মেয়ে।

এভাবে পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জিত টাকা যেমন একদিকে নিজের কাজে আসে, তেমনি পরিবারকেও সাহায্য করতে পারে মেয়েরা। ফলে ধীরে ধীরে বেকারত্বও কমে আসবে দেশে। বেকার মেয়েদের জন্য ইতিবাচক বিষয় হলো, সোনো নিজেই প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজেই দোকানের ব্যবস্থা করে থাকেন। সব ধরনের খরচই তিনি বহন করে থাকেন। দোকান ভাড়া থেকে শুরু করে সব তিনি নিজেই বহন করেন। পাশাপাশি যার দায়িত্বে দোকানটি থাকে, তাকেও তিনি বেতন দিয়ে থাকেন। অথবা কেউ চাইলে সোনোর কাছ থেকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। এসব খাবারের দোকানে বেশিরভাগ খাবারে সোনো জাপানিজ উপকরণ ব্যবহার করে থাকেন। এসব উপকরণ সব দোকানে নিজ দায়িত্বে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করেন হিরাসাওয়া সোনো।

বাংলাদেশে এখন জাপানিজ ফুড জনপ্রিয়। মানুষ খাবারের প্রতি আগের চেয়ে খুবই সচেতন। তাই সবাই চায় পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে। মসলাজাতীয় খাবার পরিহার করতে। জাপানিজ খাবারগুলো মসলাহীন। অল্প তেলে তৈরি খাবারগুলো সহজেই যে কোনো মানুষ খেতে পারেন, দামেও সস্তা।

হিরাসাওয়া সোনো বলেন, ‘গৃহিণীরাও তাদের পরিবারকে সময় দিয়ে অল্প সময় বের করে এ কাজে আসতে পারেন। যে কোনো সময় ট্রেনিং নিতে পারেন। এতে করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটা উপায় জানা থাকবে, ভবিষ্যতে এটি দিয়ে কাজ করে ইনকাম করতে পারবেন। অবদান রাখতে পারবেন সংসারে।’

সোনোর দোকানে মানুষ অল্প টাকা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার পান এবং সবার সামনে খাবারগুলো তৈরি করা হয়। পাশেই বসার ব্যবস্থা। অর্ডার করলে ক্ষণিকের মধ্যেই খাবারগুলো সুন্দরভাবে পরিবেশন করা হয়। এখন সবাই খাবারের প্রতি যত্নশীল। কোন খাবার ক্ষতিকর এবং কোনটি স্বাস্থ্যকর-এটি সবাই বুঝেশুনে খেয়ে থাকেন। জাপানিজ ফুড এখন সবার কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সবার কাছে এ ভিনদেশি খাবার প্রিয় হয়ে উঠেছে। সোনো আরও বলেন, ‘বাংলাদেশিদের কাছে খুবই ভালো সাড়া পাচ্ছি; এ খাবারের চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবন-জীবিকার জন্য ফুডকোর্ট নারীদের ভাগ্য পরিবর্তন করে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি ফলপ্রসূ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ আমার ভালো লাগে। এ দেশের মানুষও মিশুক। আমি চাই এ দেশের নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক।’

টোকিওডাঙ্গো থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী খাদিজাতুল কোবরা বলেন, ‘আমি আগের চেয়ে এখন ভালো আছি। মাত্র সাত দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি টোকিওডাঙ্গোর গুলশান শাখায়। সবচেয়ে বড় কথা আমাকে কোন ইনভেস্ট করতে হয়নি। প্রথম মাসেই আমার আয় ৫১ হাজার টাকা। আগে আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। অনেক কষ্ট করতাম। কিন্তু সে অনুযায়ী আয় করতে পারতাম না। হিরাসাওয়া সোনোর টোকিওডাঙ্গো আমার জীবন বদলে দিয়েছেন।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .