যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করছেন ট্রাম্প
আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ * সামরিক পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত সতর্কতার অভাব * সুসংগঠিত কৌশলের ঘাটতি
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক যুদ্ধনীতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও কৌশলগত অবস্থানকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ, অপ্রস্তুত কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নিজের গড়া সব সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের বদলে উলটো দেশটিকে কূটনৈতিকভাবে একা করে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তার বৈশ্বিক প্রভাবকে দুর্বল করে তুলছে।
রোববার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড একটি মতামতধর্মী প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান নীতি ও সামরিক পদক্ষেপকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন বা অধিকাংশ মিত্র দেশের সমর্থন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করেন, যা ছিল ‘বেপরোয়া’ সিদ্ধান্ত। সম্পাদকীয় বোর্ডের দাবি অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি জনগণের সামনে পরিষ্কার বা একক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। তবে এর পরের ছয় সপ্তাহেই এই বেপরোয়া সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সামরিক পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত সতর্কতা নেননি এবং আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যখন ট্রাম্পকে বলেছিলেন, এই হামলা ইরানে গণবিক্ষোভ ঘটাবে, তখন সিআইএর গোয়েন্দা পরিচালক এই ধারণাকে ‘অবাস্তব’ বলে অভিহিত করেন। তবুও ট্রাম্প এগিয়ে যান। তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে ইরানের সম্ভাব্য পালটা পদক্ষেপ মোকাবিলার জন্যও কোনো পরিকল্পনা করেননি তিনি। যেমন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়ানো বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রক্ষা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুসংগঠিত কৌশল ছিল না।
অবশেষে শনিবার একটি যুদ্ধবিরতির আলোচনায় সম্মত হন ট্রাম্প। তবে ব্যর্থ হয় সেই আলোচনাও। চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে রাজি হয়নি ইরান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে। মূল সমস্যা দেখা দিয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে। এ বিষয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে ইরান বলেছে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির স্বাক্ষরকারী হিসাবে নিজের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা তাদের অধিকার। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটাই প্রমাণ করে ইরান সব সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ রাখতে চায়। যদিও ইরান বলছে, শুরু থেকেই যুদ্ধবিরতি বানচালের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রই। ট্রাম্পের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপমানজনক কৌশলগত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে বলেও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার ফলে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে তেহরান। দেশটির নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিও কিছুটা পিছিয়ে গেছে। তবে এসব সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির দিকগুলো ঢেকে রাখতে পারে না। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়েছে যা বৈশ্বিক গণতন্ত্রকেও দুর্বল করছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন চীন ও রাশিয়ার মতো স্বৈরশাসক শক্তি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ব্যবহার করে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এদিকে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন তিনটি কঠিন পথ খোলা আছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসের আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ আবার শুরু করা, যা ইতোমধ্যে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া। তবে ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।
