Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই

২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সারা দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলনের স্মৃতি ও তাৎপর্য স্মরণ করা হচ্ছে। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এ গণ-অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত। অভ্যুত্থানে তরুণ সমাজের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। নানা বাধা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাধারণ মানুষও এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, জনগণের ঐক্য ও প্রচেষ্টার কাছে যে কোনো অশুভ শক্তি পরাজিত হতে বাধ্য।

অশুভ শক্তির পরাজয়ের পর থেকেই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল গণ-অভ্যুত্থানে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আন্দোলন দমনে ‘স্নাইপার’ ব্যবহারের অভিযোগ অন্যতম। এ বিষয়ে কারও কারও বক্তব্য, দাবি ও প্রতিদাবি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টকশো এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে এ নিয়ে ভিন্নমুখী মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির অনেকগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে আসল তথ্য উন্মোচন করা হয়নি। এমন সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হলে যাচাই করা তথ্য, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি বা স্বীকৃত তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করা জরুরি। গুজব, অসমর্থিত তথ্য বা রাজনৈতিক বক্তব্যকে প্রমাণিত সত্য হিসাবে প্রচার করলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবেই। অশুভ শক্তির মূল উদ্দেশ্যও তাই। বিতর্ক সৃষ্টি করে যে কোনো উপায়ে নিজেদের অপরাধ লঘু করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবেই। এ ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ যে কোনো বিভ্রান্তি দূর করার অন্যতম শর্ত এবং এ শর্ত পূরণের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়।

‘স্নাইপার রহস্য’ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট রাওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে স্নাইপার প্রসঙ্গ টেনে কিছু তথ্য শেয়ার করেন। তিনি বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত প্রায় সবাইকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এটি ছিল স্নাইপার অ্যাটাক। আহতদের মধ্যে যারা চোখ হারিয়েছেন, তারাও স্নাইপার অ্যাটাকের শিকার। জুলাইজুড়ে ছিল প্রফেশনাল স্নাইপার অ্যাটাক। এটি বাংলাদেশের পুলিশ করেনি। বাংলাদেশের পুলিশের স্নাইপার রাইফেল শুটিংয়ের প্রশিক্ষণও নেই।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘৪ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের একটি দলের সঙ্গে তিনি হাঁটতে হাঁটতে যখন মহাখালীর শাহীন কমপ্লেক্সের কাছে পৌঁছান, তখন তার কাছে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা থেকে একটি ফোনকল আসে। ফোনে এক কর্মকর্তা তাকে বলেন, ‘স্যার আপনি স্নাইপারদের টার্গেট এরিয়ায় ঢুকে পড়েছেন, দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করুন।’ তিনি অবশ্য গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেননি। এর আগেও তিনি অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৭.৬২ মিমি ক্যালিবারের অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বক্তব্যের ‘স্নাইপার’ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তিমূলক আলোচনা শুরু করলে তিনি এ বিভ্রান্তি দূর করার জন্য পরে আরও কিছু তথ্য উপস্থাপন করেন, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ইঙ্গিতবহ। অথচ স্নাইপার রহস্য নিয়ে যারা বিভ্রান্তি ছড়ান, তারা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াতের দেওয়া এসব তথ্যের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান।

তিনি বলেছেন, ‘লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি পরা হেলমেট লাগানো হাতে পুলিশের রাইফেল। এমন ট্রেইন্ড স্নাইপার কয়েকজনকে তো আমরা দেখলাম হেলিকপ্টারে উঠানো হয়েছিল। তাদের দেহের গঠন তো আমাদের মতো না!’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘পুলিশের এ রাইফেলগুলো সিভিলিয়ানদের কাছে গিয়েছিল কীভাবে? আমি তো এদের বিষয়ে ‘বহিরাগত’ শব্দটি ব্যবহার করেছি, এমন ট্রেইন্ড স্নাইপার আমরা তো দেখলাম হেলিকপ্টারে উঠানো হয়েছে!” এ প্রসঙ্গে তিনি আরও দাবি করেন, তার কাছে এমনও অনেক ছবি আছে সন্দেহজনক, এরা কারা? যাদের চেহারা আমাদের মতো না। সাংবাদিক যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তার মানে বলছেন এরা দেশের বাইরে থেকে এসেছে’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘তদন্ত না করলে তো বলা যাবে না! আমি তো তদন্ত করতে চেয়েছিলাম।’

আগেই উল্লেখ করেছি, স্বার্থান্বেষী মহলের বয়ানে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াতের ওপরে উল্লেখিত বক্তব্যের অংশটুকু থাকে না। অর্থাৎ পুলিশের অস্ত্র কীভাবে স্নাইপারদের হাতে গেল এবং কোন অথরিটিতে কথিত সিভিলিয়ানদের সামরিক হেলিকপ্টারে তোলা হয়েছিল ইত্যাদি। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল, যাতে দেখা গেছে, ঢাকার কোনো এক উঁচু ভবন থেকে কমবেট কালারের একটি হেলিকপ্টারে বেশ কয়েকজন সিভিল ব্যক্তিকে তুলে নেওয়া হচ্ছে; যাদের কয়েকজন সাদা লুঙ্গি পরা ছিলেন। ওই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সরকারের অনুমোদন ছাড়া সামরিক হেলিকপ্টারে লুঙ্গি পরা সিভিলিয়ানদের উদ্ধার করা যে সম্ভব নয়, তা যে কেউ বোঝেন। অপরদিকে, সরকারের গোয়েন্দা কর্মকর্তা টেলিফোনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াতকে জানান, তিনি শাহীন কমপ্লেক্সের কাছে স্নাইপারের টার্গেট জোনে প্রবেশ করেছেন। তার মানে, ওই কর্মকর্তা নিশ্চিতভাবেই জানেন, ওই এলাকার আশপাশের কোনো ভবনে স্নাইপার অবস্থান করছে। পাঠক, লক্ষ করে দেখুন, শাহীন কমপ্লেক্সের আশপাশে যতগুলো ভবন আছে, তার সবই সরকারি ভবন (অধিকাংশ সামরিক স্থাপনা), বেসরকারি ভবন নেই। অতএব, এটি স্পষ্ট, হাসিনা সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অবশ্যই জানতেন, ঢাকা শহরের কোন কোন স্পটে স্নাইপাররা অবস্থান করছে এবং সরকারের নীলনকশা অনুযায়ীই এসব স্নাইপার আন্দোলনকারীর ওপর গুলি চালিয়েছে।

পত্র-পত্রিকা, টকশো এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তকারীদের বয়ানে আমরা এর সম্পূর্ণ উলটো বর্ণনা পাই। তাদের ভাষায়, ‘‘স্নাইপাররা কি কোনো বিশেষ মহলের ইন্ধনে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিল? তাদের লক্ষ্য কি কেবল সরকার উৎখাত নয়, বরং শেখ হাসিনাকে সরাসরি হত্যার ষড়যন্ত্রও ছিল? এ তথাকথিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কী ছিল? সাধারণ মানুষকে হত্যা করে আন্দোলনকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘রাষ্ট্রীয় গণহত্যা’ হিসাবে প্রচার করা? নাকি শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে দেশের নেতৃত্বশূন্য করার পরিকল্পনা?” তাদের মূল লক্ষ্যই হলো, এসব বয়ান বেশি বেশি প্রচার করে বিতর্কের সৃষ্টি করা; যাতে গণ-অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।

এদেশের একজন নাগরিক হিসাবে মনে করি, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে এসব বিভ্রান্তি দূর করা উচিত। তদন্ত করা সরকারেরই দায়িত্ব। স্নাইপার কিংবা সিভিলিয়ানদের হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তাদের পরিচয়ও বের করা কঠিন হবে না। যে সামরিক হেলিকপ্টারে সিভিলিয়ানদের নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল; সেদিনের ‘ফ্লাইং অথোরাইজেশন বুক’ দেখলেই ওই হেলিকপ্টারের পাইলটের পরিচয় পাওয়া যাবে এবং তিনিই ওই সিভিলিয়ানদের আসল পরিচয় দিতে পারবেন।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত স্নাইপারদের শারীরিক গঠন নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশে বিদেশি এজেন্ট কিংবা বিদেশি কিলারদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন নয়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের জন্য গঠিত জাতীয় তদন্ত কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার একজন সেনা কর্মকর্তার সহধর্মিণীর বক্তব্যেও পিলখানার ভেতর বিদেশি ভাষাভাষী ব্যক্তিদের উপস্থিতির কথা আমরা শুনতে পেয়েছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার এ বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেবে কি? আমার মনে হয়, স্নাইপার নিয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, তা দূর করার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত। স্নাইপার রহস্য জিইয়ে না রেখে প্রতিটি ঘটনার নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। স্বার্থান্বেষী মহলের এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে যাচাইবিহীন তথ্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবির ওপর নির্ভর না করে ফরেনসিক প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ভিডিও বিশ্লেষণ এবং বিচারিক তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত। নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তই প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণ করতে পারবে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .