নিউইয়র্কের চিঠি
‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ করতে ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্যাথে প্যাসিফিকের ফ্লাইটে হংকং হয়ে বেশ কয়েকবার ঢাকা-নিউইয়র্ক-ঢাকা যাতায়াত করলেও ২০১০ সালের ১২ মে সকালে নিউইয়র্ক থেকে বিমানে আরোহণের অগ্রাধিকার অনুযায়ী শিশুসহ মাদের আহ্বান করা হলে প্রথমবারের মতো ৪০টি নবজাত শিশুকে নিয়ে তাদের মাদের বিমানে আরোহণ করতে দেখেছি।
তাদের মধ্যে ১০টি শিশুকে ধরে নিতে পারি, চীনা বংশোদ্ভূত ন্যাচারালাইজ্ড আমেরিকানের সন্তান। অবশিষ্ট ৩০ জনই যে তাদের প্রেগন্যান্সির অ্যাডভান্স স্টেজে ‘বি-২’ বা ট্যুরিস্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে এসে সন্তান জন্মের পর তাদের আমেরিকান বার্থ সার্টিফিকেট নিয়ে দেশে ফিরে যাচ্ছেন, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
১৮৬৮ সালের আমেরিকান সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী যুক্তরাষ্ট্রে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে সবার ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের’ অধিকার দিয়েছে। এ সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী কোনো গর্ভবতী নারী, তার জাতীয়তা, ধর্ম, বর্ণ যাই হোক না কেন, তিনি যদি আমেরিকান ভূখণ্ডে এবং আমেরিকান জলসীমায় আমেরিকান পতাকাবাহী জাহাজে বা আমেরিকান আকাশসীমায় আমেরিকান পতাকাবাহী বিমানে সন্তানের জন্ম দেন, তাহলে তার সন্তান জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিকত্ব লাভ করে।
কিন্তু সে সংখ্যা যে এত বিপুল হতে পারে, আমার নিউইয়র্ক-হংকং বিমানযাত্রায় তা দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বেশকিছু বিমানবন্দর থেকে প্রায় এক ডজন চীনা ও আমেরিকান এয়ারলাইন্স হংকং ছাড়াও মেইনল্যান্ড চীনের বিভিন্ন বিমানবন্দরে প্রায় ৫০টি ফ্লাইট অপারেট করে। শুধু হংকংগামী একটি ফ্লাইটেই যদি এতগুলো সদ্যোজাত শিশু নিউইয়র্ক থেকে তাদের মায়ের দেশে যায়, তাহলে সারা বছর এ সংখ্যা কত হতে পারে? চীন ছাড়া পৃথিবীর আরও অনেক দেশ নিশ্চয়ই একই কৌশল অবলম্বন করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টির ‘বার্থরাইট সিটিজেনশিপ’ বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে তার প্রথম মেয়াদে এর বিরোধিতা করলেও তখন এ অধিকার খর্ব করার জোরালো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কারণ এ অধিকার বাতিল করতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিতকারী সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর অধিকতর সংশোধন আনতে যে কাঠখড় পোড়ানোর প্রয়োজন হবে, তা রিপাবলিকানরা অদূর ভবিষ্যতে তো পূরণ করতে পারবেই না, সুদূর ভবিষ্যতেও তাদের পক্ষে তা সম্ভব হবে বলে যারা আশা করেন, তারা দিবাস্বপ্নের মধ্যে রয়েছেন।
এ সংশোধনী অনুমোদিত হওয়ার পর এটিকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক মামলা হয়েছে, অনেক প্রেসিডেন্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার খর্ব বা সীমিত করার উদ্দেশ্যে তাদের নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। এ ধরনের প্রতিটি নির্বাহী আদেশ আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে এবং প্রেসিডেন্টদের আদেশ কখনো বাস্তবায়িত হতে পারেনি। সুপ্রিমকোর্ট প্রতিবার কমবেশি একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এ ধরনের নির্বাহী আদেশ বা প্রচেষ্টা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১২৮ বছর আগে ১৮৯৮ সালে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ওপর ‘যুক্তরাষ্ট্র বনাম ওং কিম’ মামলায় সুপ্রিমকোর্ট যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, সেটিই এখনো প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। ওই মামলার রায়ে বলা হয়েছিল, ‘‘অভিবাসী বাবা-মায়ের যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা জন্মের সময়ই নাগরিক। একমাত্র সংকীর্ণ ব্যতিক্রম হলো বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তানরা, যাদের যুক্তরাষ্ট্রের ‘এখতিয়ারের অধীন’ বলে বিবেচনা করা হয় না।’’
এছাড়া আমেরিকান আইনও বিদেশে জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান নাগরিকদের সন্তানদেরও তাদের বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনের অনুমতি দেয়, যদি নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করা হয়। একই সঙ্গে, এই শর্তগুলো একজন আমেরিকান কে, তা নির্ধারণের জন্য স্পষ্ট, ন্যায্য এবং জাতি-নিরপেক্ষ মানদণ্ড তৈরি করে, যা বংশপরিচয়, সম্পদ বা গায়ের রঙের ওপর নির্ভর করে না। এসব আইন থাকা সত্ত্বেও রিপাবলিকান রাজনীতিকরা তাদের প্রচারণার স্বার্থে অথবা আমেরিকাকে শ্বেতাঙ্গপ্রধান আমেরিকায় পরিণত করার উদ্দেশ্যে তাদের দল ক্ষমতায় এলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার খর্ব করার ব্যর্থ উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক মাঠ সোচ্চার রাখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশই যেখানে সর্বোচ্চ আদালত আটকে দেন, সেক্ষেত্রে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান পালটে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী কাউকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা অসম্ভব এক ব্যাপার। কারণ, কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীর জন্য কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশের অনুমোদন এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর তিন-চতুর্থাংশের অনুসমর্থন আবশ্যক। এ সত্য সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দল ভালোভাবেই অবহিত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার খর্ব বা সীমিত করতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, অর্থাৎ হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেই যে নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, সুপ্রিমকোর্ট চলতি বছরের জুনে তা আটকে দেওয়ার পর তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। ৬ আগস্ট তিনি আরেকটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যাতে কোনো বিদেশি নারী আমেরিকান ভূখণ্ডে সন্তান জন্ম দিলেই নবজাত সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমেরিকান নাগরিক না হতে পারে।
ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশের উদ্দেশ্য, তার ভাষায়, ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ করা এবং এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে তার প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, প্রেসিডেন্টের ৬ আগস্টের আদেশটিও সুপ্রিমকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হবে এবং আরও নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, চ্যালেঞ্জকারীরা অভিন্ন যুক্তি দেবেন যে, নতুন বিধিনিষেধগুলো সুপ্রিমকোর্টের আগের রায়গুলোতেই নির্ধারিত-জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ দ্বারা রহিত করা সম্ভব নয়।
তবে ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব খর্ব করার প্রথম নির্বাহী আদেশ সুপ্রিমকোর্ট বাতিল করার পর এ সংক্রান্ত নতুন আদেশ বা যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ করার আদেশ জারির এক সপ্তাহের মধ্যে উত্তর আফ্রিকার একটি দেশের নাগরিকদের আমেরিকান ‘বার্থ ট্যুরিজম’ সন্দেহে ১০০টির বেশি ভিসা বাতিল করেছে, যারা আমেরিকান ভিসা সংগ্রহ করেছিলেন মূলত তাদের অনাগত সন্তানদের মার্কিন নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট দেশটির নাম উল্লেখ না করে বলেছে, উত্তর আফ্রিকার দেশটিতে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাস উল্লিখিতসংখ্যক ভিসা বাতিল করেছে। পাশাপাশি ভিসা লাভের উদ্দেশ্যে যেসব দলিলপত্র প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে, সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাইয়ে সেগুলোতে অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় ভিসার আবেদন নাকচ হওয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর প্রতি মাসে বিশ্বজুড়ে আমেরিকান দূতাবাসগুলো ১০ হাজারের বেশি ভিসা আবেদন বাতিল করেছে, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন ছিল ‘বার্থ ট্যুরিজমের’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
গত সপ্তাহে জারি করা নতুন নির্বাহী আদেশের আওতায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন শ্রেণির বিদেশি নাগরিকের সন্তান আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করলেও আমেরিকান নাগরিকত্ব পাবে না, সেই তালিকা বিস্তৃত করা হয়েছে। এ আদেশে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর মা-বাবা দুজনের কেউই যদি মার্কিন নাগরিক না হন, তাহলে শিশুটিকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। যেমন, ওই শিশুর মা-বাবার কেউ একজন যদি কোনো বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হন, কোনো বিদেশি সরকারের কর্মী হন, প্রতারণার মাধ্যমে আমেরিকান নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন-এসব ক্ষেত্রে শিশুটি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে না। বার্থ ট্যুরিজম বন্ধ করার জন্য স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটিকে আদেশের প্রতিটি দিক চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আদেশে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিতে আকৃষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে যারা জড়িত, তাদের দমনে সেসব দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে ভিসাপ্রার্থীরা প্রলোভনের ফাঁদে পা না দেন।
আদেশ জারির সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিদের কাছে ‘যুক্তরাষ্ট্রে বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে কয়েক লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে’ বলে দাবি করলেও তিনি তার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি। তিনি এ কথাও বলেননি যে, তার কথিত সংখ্যা প্রতিবছরের, নাকি মোট সংখ্যা। সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ট্যুরিস্ট ভিসায় কতজন নারী যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ফেডারেল এজেন্সি সেন্টারর্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ঠিকানাধারী মায়েরা সাড়ে ৯ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম দিয়েছেন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রে মোট ৩৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ঠিকানার মায়েদের জন্ম দেওয়া সন্তান মোট জন্ম নেওয়া শিশুর প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউট মনে করে, প্রকৃত সংখ্যা আরও কম হতে পারে।
‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধের উদ্যোগের আগে থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসীদের ওপর খক্ষহস্ত। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর গত জুলাই পর্যন্ত ১৮ মাসে অভিবাসন বিভাগ ৩০ লাখেরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করেছে, যাদের মধ্যে অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হাজার হাজার অভিবাসীও রয়েছেন। অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে আমেরিকাকে নিরাপদ করতে ৭৫টি দেশকে আমেরিকার জন্য উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা বন্ধ ও সীমিত করা হয়েছে এবং ১৪ লাখেরও বেশি অবৈধ বিদেশির জন্য পরিচালিত সুবিধা বন্ধ করাসহ অভিবাসন ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে যে কড়াকড়ি আনা হয়েছে, ‘বার্থ ট্যুরিজম’ সেসবের মধ্যে নতুন সংযোজন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের এ আদেশটিও বাতিল করবেন।
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক
