Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সাংবিধানিক অধিকার

Icon

ড. কে আহমেদ আলম

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সাংবিধানিক অধিকার

ফাইল ছবি

ভূরাজনীতি, রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং মানবাধিকার আলোচনায় ‘দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা’ শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়; বরং এটি দীর্ঘ আটাত্তর বছর জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টিজনিত অবহেলা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মানবিক অধিকার হরণের এক জীবন্ত দলিল। উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার অন্তর্গত এ ভূখণ্ডটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ছিটমহল। চারপাশে ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত এ জনপদের মানুষ দশকের পর দশক সহ্য করেছে এক অমানবিক ‘রাষ্ট্রহীনতা’র যাতনা। পরবর্তীকালে, ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তৎকালীন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের আমলে তিনবিঘা করিডর বাংলাদেশিদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার ভৌগোলিক সংযোগের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হলেও বাস্তব সত্য হলো-এখানকার মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের সংকট আজও পুরোপুরি দূর হয়নি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে অসংখ্য ছিটমহলের সৃষ্টি হয়। এসব ছিটমহলের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ছিটমহল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ছিটমহল, উভয় ধরনের ভূখণ্ডই ছিল। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার অবসান ঘটে। চূড়ান্ত বিনিময়ের সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের মোট আয়তন ছিল প্রায় ১৭,১৬০ একর, আর ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের আয়তন ছিল প্রায় ৭,১১০ একর।

ছিটমহল বিনিময় ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও কূটনৈতিক অর্জন। ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং পরবর্তী ২০১১ সালের প্রটোকলের ভিত্তিতে দীর্ঘ আলোচনার পর ভারত ও বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময়ের পথ চূড়ান্ত করে। ২০১৫ সালে ভারতের সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নের সাংবিধানিক বাধা দূর হয় এবং একই বছরের ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত দশকের একটি জটিল সীমান্ত সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়। তবে শুধু ভূখণ্ডের বিনিময় নয়, বাসিন্দাদের নাগরিকত্বের পছন্দ, পুনর্বাসন, ভূমির মালিকানা এবং প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করাও ছিল এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সঙ্গে ‘তিনবিঘা করিডর’ বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য ভারতের তিনবিঘা এলাকার মধ্য দিয়ে একটি করিডর ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তিতে ভারতকে বেরুবাড়ী ইউনিয়ন দিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষের যোগাযোগের জন্য তিনবিঘা করিডর বাংলাদেশের ব্যবহারের বিষয়ে নীতিগত ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে ভারত করিডরটি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবহারের সুযোগ দেয়।

যে কোনো জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক পরিবর্তনের প্রাথমিক চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। অথচ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাজুক অবস্থা সেখানকার তরুণ প্রজন্মকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দহগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট এবং দহগ্রাম বালার ডাঙ্গা দাখিল মাদ্রাসার অবকাঠামোগত চরম বেহাল দশার কারণে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘকাল প্রান্তিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হওয়ার কারণে এ এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মৌলিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা যেন এখনো এক দুর্লভ বিষয়। এলাকায় অবস্থিত দহগ্রাম হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, আধুনিক সরঞ্জাম ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবার তীব্র অভাব রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত বিচ্ছিন্নতার কারণে এই অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প স্থাপনের পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, যেন স্থানীয় তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি যোগ হয়েছে তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙন। তিস্তাপাড়ের এ অবহেলিত ভূখণ্ড রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। পাশাপাশি পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাকোয়া নদী খনন না করলে শুষ্ক ও বর্ষা উভয় মৌসুমেই এ এলাকার কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা শুধু রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্যই নয়, স্থানীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। সীমান্ত অপরাধ ও মাদক চোরাচালান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় অবিলম্বে আরও অন্তত তিনটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্প স্থাপন করা আবশ্যক।

সম্প্রতি দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করতে চাই। এটি হলো দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার একটি জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার আকুতি ও সংবিধানে ঘোষিত অধিকারের দাবি। সংক্ষেপে এই দাবিগুলো হলো : ১. দহগ্রাম সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক অনতিবিলম্বে নিয়োগ দিতে হবে; ২. দহগ্রাম বালার ডাঙ্গা দাখিল মাদ্রাসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করতে হবে; ৩. দহগ্রাম হাসপাতালে সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে হবে; ৪. তিনবিঘা করিডরের ওপর দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে; ৫. গবাদি পশু তিনবিঘা করিডরের ওপর দিয়ে অবাধে আনা-নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে; ৬. নদীগর্ভ থেকে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাকে রক্ষা করার জন্য তিস্তাপাড়ে বাঁধ নির্মাণসহ নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে; ৭. শুকনো মৌসুমে প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়া সাকোয়া নদী খনন করতে হবে; ৮. এ ইউনিয়নে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প চালু করতে হবে; ৯. দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় আরও তিনটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে; ১০. মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে হবে; ১১. দীর্ঘ দিনের অবহেলিত এলাকা হওয়ায় এখানকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া ও চাকরির জন্য যৌক্তিক কোটা সংরক্ষণ করতে হবে।

রাষ্ট্রহীনতার ঐতিহাসিক ক্ষত মুছে ফেলে এ জনপদকে দেশের অন্য অঞ্চলের মতো সমমানের প্রবৃদ্ধি ও নাগরিক মর্যাদায় উন্নীত করা বর্তমান সময়ের দাবি। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের উচিত এই ১১ দফা দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা। তিনবিঘা করিডরের ওপারের ভূখণ্ড যেন শুধু মানচিত্রের এক খণ্ড জমি হয়ে না থাকে, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বৈষম্যহীনতা ও উন্নয়নের এক অনন্য প্রতীক হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ড. কে আহমেদ আলম : দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার অধিবাসী; ডিন, কলা অনুষদ, বিইউবিটি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .