জাহাজ ভাঙা শিল্প : সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তাগত বাস্তবতা
দিলশাদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় খাত। দেশের ইস্পাতশিল্পের কাঁচামালের বড় একটি অংশ আসে এ শিল্প থেকে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি ব্যয় হ্রাস, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার ক্ষেত্রে সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ শিল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকের মৃত্যু এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও জড়িয়ে আছে। সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং আরও ১৪ জনের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা বিষয়টি নিয়ে আবারও গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
তবে এ শিল্পকে শুধু দুর্ঘটনা ও নেতিবাচকতার দৃষ্টিতে দেখাও বাস্তবতার পুরো চিত্র তুলে ধরে না। একসময় আন্তর্জাতিক মহলে সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোকে মূলত পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তার ঝুঁকির সঙ্গে দেখা হতো। কিন্তু গত এক দশকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সেই চিত্র অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এসব উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক স্বীকৃতি অর্জনের সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন জনপ্রিয় ও স্বনামধন্য উদ্যোক্তা বুঝতে পেরেছেন যে, ভবিষ্যতের জাহাজভাঙা শিল্প শুধু শ্রমিকের শক্তি ও প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। তাদের বিনিয়োগ ও উদ্যোগের ফলে কিছু ইয়ার্ডে উন্নত প্রযুক্তি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষিত শ্রমিক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে এ শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এমন উদ্যোগ শুধু তাদের নিজস্ব ব্যবসার সুনাম বাড়ায়নি; বরং পুরো বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পের ভাবমূর্তিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সব ইয়ার্ড একই গতিতে এগিয়ে আসেনি। কিছু মালিক আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, শ্রমিক প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে যথেষ্ট উদ্যোগ নেননি। এ বৈপরীত্য শুধু শিল্পের জন্য নয়, বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্যও উদ্বেগজনক।
সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, জাহাজের ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করেই শ্রমিকদের বিপজ্জনক স্থানে কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। তবে অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তাহলে এটি অত্যন্ত গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতা। কারণ, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও বদ্ধ স্থানগুলোয় বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা এবং নিরাপদ ঘোষণা করা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মৌলিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়া।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্ঘটনার আগে সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে নোটিশ এবং পরবর্তী সময়ে মামলা করার তথ্য সামনে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পরও যদি শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে থাকেন, তাহলে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবশ্যই কোনো দুর্ঘটনার জন্য পুরো শিল্পকে দোষারোপ করা উচিত নয়। বরং যারা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শিপ রিসাইক্লিংয়ের জন্য বিনিয়োগ করছেন, তাদের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা দরকার। তাদের অর্জিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অভিজ্ঞতাকে অন্য ইয়ার্ডগুলোর জন্য মডেল হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকার, শিল্প মালিকদের সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো চাইলে উন্নত ইয়ার্ডগুলোর ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ অনুসরণ করে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা ইয়ার্ডগুলোর জন্য একটি বাধ্যতামূলক উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করতে পারে।
শ্রমিক নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। প্রতিটি ইয়ার্ডে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা, গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেশন, বদ্ধ স্থানে কাজের অনুমতি, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পরিদর্শন ও নিরাপত্তা অডিট বাধ্যতামূলক করা উচিত। শুধু কাগজে সার্টিফিকেট থাকলেই হবে না; বাস্তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর আছে কি না, তাও হতে হবে মূল বিবেচনা।
জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকদের প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা থাকা দরকার, নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; এটি বিনিয়োগ। শ্রমিক নিরাপদ থাকলে উৎপাদনও নিরাপদ থাকে, প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ে। গত দশ বছরে যারা গ্রিন ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক মান অর্জনে উদ্যোগ নিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছেন। এখন সেই পরিবর্তনকে পুরো শিল্পে ছড়িয়ে দেওয়ার সময়।
সরকারেরও উচিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি ইতিবাচক প্রণোদনা চালু করা। যারা আন্তর্জাতিক মানের গ্রিন ইয়ার্ড পরিচালনা করছেন, তাদের কর সুবিধা, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা বা অন্যান্য নীতিগত সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে যারা বারবার নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই শিল্পে কেউ নিরাপত্তায় কোটি টাকা বিনিয়োগ করবেন আর কেউ ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যয়ও করবেন না, এভাবে একটি টেকসই শিল্পব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না।
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ করার প্রশ্ন নয়; বরং এটিকে আরও আধুনিক, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে পরিণত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ এ শিল্পের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, ইস্পাতশিল্প এবং হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা জড়িত।
একটি জাহাজ কত দ্রুত কাটা হলো, কত টন লোহা উদ্ধার হলো কিংবা কত টাকা মুনাফা হলো, শুধু এসব দিয়ে কোনো শিল্পের সাফল্য বিচার করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন শ্রমিক দিনের কাজ শেষে নিরাপদে তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেন, পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে এবং শিল্পটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা শিল্পের সামনে তাই এখন একটিই পথ-যারা পরিবর্তন এনেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে সবাইকে নিরাপদ, সবুজ ও আধুনিক জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের পথে এগিয়ে যেতে হবে। শ্রমিকের জীবন রক্ষা করেই হতে হবে শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন।
দিলশাদ আহমেদ : সমাজ বিশ্লেষক ও প্রাবন্ধিক
