Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

ডেঙ্গু কেবল রোগ নয়, জনস্বাস্থ্য-নিরাপত্তার ইস্যু

Icon

ডা. এম. সেলিম উজ্জামান

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু কেবল রোগ নয়, জনস্বাস্থ্য-নিরাপত্তার ইস্যু

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশগত অবনতি, মানব আচরণের পরিবর্তন এবং দুর্বল মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমন্বয়ে সৃষ্ট একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সংকট। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ফলে ডেঙ্গুকে শুধু স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা হিসাবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য-নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচনা করতে হবে।

ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মশাবাহিত রোগের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা এবং আর্দ্রতা বৃদ্ধি এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

একসময় ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে অন্য সময়েও রোগটির বিস্তার দেখা যাচ্ছে। জলবায়ুর এ পরিবর্তন শুধু মশার বংশবিস্তারই বাড়াচ্ছে না, বরং ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জলবায়ু অভিযোজনকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। আবহাওয়াভিত্তিক পূর্বাভাস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের দেশে এখনো অনেকের ধারণা, ফগিং করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাস্তবে এটি আংশিক এবং সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। এডিস মশা সাধারণত বাসাবাড়ির ভেতরে বা আশপাশে জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। সাধারণত ছাদের টব, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং বিভিন্ন জলাধার এডিস মশার প্রধান প্রজননস্থল। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল হতে হবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। সারা বছর নিয়মিত লার্ভা জরিপ, মশার ঘনত্ব নিরূপণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মানুষের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এডিস মশা মূলত মানুষের বসবাসের পরিবেশেই বংশবিস্তার করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক মানুষ এখনো মনে করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের। এ মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

প্রতিটি পরিবারকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার করতে হবে। জমে থাকা পানি অপসারণ, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বস্তু সরিয়ে ফেলার মতো সহজ পদক্ষেপগুলো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ভেক্টর (সংক্রমণ বাহক) ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট (আইভিএম) পদ্ধতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে-পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, জৈব ও রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ, জনগোষ্ঠী (কমিউনিটির) অংশগ্রহণ, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আন্তঃখাত/বহুখাতভিত্তিক সমন্বয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

কোনো দেশই জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হয়নি। চেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি জনগণকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে।

প্রতি সপ্তাহে/মাসে একবার, একটি নির্দিষ্ট দিনকে ‘ডেঙ্গু পরিচ্ছন্নতা দিবস’ হিসাবে পালন করা হলে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম কারণ। বন্ধ ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এডিস মশার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।

তাই পরিবেশগত উন্নত পরিচ্ছন্নতাকে (স্যানিটেশন) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন পরিষ্কার রাখা, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নির্মাণ কাজে যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যায়। কিন্তু সংকট শুরু হওয়ার পর নয়, বরং তার আগেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার চালু করা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও পরীক্ষার সরঞ্জাম মজুত রাখা এবং কার্যকর রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে উচ্চ সংক্রমণ প্রবণ এলাকায় নির্দিষ্ট বয়সি শিশুদের জন্য ডেঙ্গু টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। তবে টিকাকে কখনোই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একমাত্র সমাধান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বাংলাদেশে ডেঙ্গু টিকা প্রবর্তনের আগে রোগের প্রকোপ, ভাইরাসের ধরন, টিকার কার্যকারিতা, ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা প্রয়োজন। টিকা অবশ্যই একটি সমন্বিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগীর সংখ্যা গণনা করলেই হবে না; বরং একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা (সার্ভেইলেন্স) গড়ে তুলতে হবে। বাস্তব সময়ের (রিয়েল-টাইম) রোগ নজরদারি, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ, জিআইএস-ভিত্তিক হটস্পট চিহ্নিতকরণ এবং ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর হলে রোগের বিস্তার শুরু হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে বর্ষা শুরু হওয়ার পর জোরদার করা হয়। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বর্ষা শুরু হওয়ার অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে থেকেই মশার ঘনত্ব নিরূপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ভেক্টর (সংক্রমণ বাহক) ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত উন্নত পরিচ্ছন্নতা (স্যানিটেশন), জনগোষ্ঠী (কমিউনিটির) সম্পৃক্ততা/অংশগ্রহণ, কার্যকর নজরদারি (সার্ভেইলেন্স), প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক টিকা ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি মৌসুমি কর্মসূচি নয়, বরং সারা বছরের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। অন্যথায় আগামী দিনের বাংলাদেশকে আরও বড় ডেঙ্গু সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

ডা: এম. সেলিম উজ্জামান : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, দক্ষতা: সংক্রামক রোগ, ডিজিজ সার্ভিলেন্স এবং হেলথ সিকিউরিটি, ডিজিজ সার্ভিলেন্স

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .