প্রধানমন্ত্রীকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না
ব্রি. জে. (অব.) এটিএম জিয়াউল হাসান
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। একটি সরকারকে চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করার জন্য ছয় মাস খুব অল্প সময়; কিন্তু উদ্বেগের জায়গাগুলো নিয়ে নীরব থাকার জন্য সময়টা আর এত কম নয়। এ লেখা সেই দুই সময়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন একজন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে, যিনি সাধারণের কাতারে দীর্ঘ সতেরো বছর অপেক্ষা করেছিলেন শুধু এটা বলার জন্য-‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি সফল হোন।’ কারণ আপনি অসফল হলে তার মূল্য শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে নয়, পুরো বাংলাদেশকেই দিতে হবে।
বিএনপি কেবল একটি নির্বাচনে জয়ী হয়নি; জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। একই সময়ে গণভোটে জনগণ ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অর্থাৎ সরকার শুধু দেশ পরিচালনার নয়, রাষ্ট্র মেরামতের ম্যান্ডেট পেয়েছে। গত পনেরো বছরে রাষ্ট্র ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে-পুলিশ দলীয় আনুগত্য শিখেছে, আদালত অন্যায়ের দিকে না তাকানোর অভ্যাস করেছে, আমলাতন্ত্র দলীয় প্রশাসনে পরিণত হয়েছে, আর অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে ধার করা আস্থা ও চাপা দুর্বলতার ওপর।
এ বাস্তবতার ভেতরেও প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই ক্ষমতার আবহ বদলেছেন। প্রটোকল কমেছে, গাড়িবহর ছোট হয়েছে। গোটা শহর আটকে রাখার পুরোনো সংস্কৃতি অনেকটাই কমেছে। তিনি সচিবালয় থেকে কাজ করছেন; মন্ত্রী-সচিবদের উপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতার চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যয়ে সংযম দেখিয়েছেন, পরিবারকে ক্ষমতার বলয়ের বাইরে রেখেছেন। প্রথমেই নয়াদিল্লি না গিয়ে কুয়ালালামপুর ও বেইজিংকে বেছে নেওয়া ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা।
তার নেতৃত্বের কয়েকটি বিরল বৈশিষ্ট্য আছে। তিনি কথা কম বলেন, কাজকে সামনে রাখেন। নীরবতা সব সময় দুর্বলতা নয়; সংযত বক্তব্যও নেতৃত্বের শৃঙ্খলা। তিনি প্রতিহিংসাপরায়ণ হননি। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত না করে অতীতের হিসাব আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী।
ঘরের ঘুণপোকা আগে থামান। দলের ভেতরে উচ্চপর্যায়ের কিছু নেতা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে বাইরের শক্তির ক্রীড়নক হিসাবে অন্তর্ঘাতমূলক কাজে নিয়োজিত। জুলাই থেকে উঠে আসা তরুণ শক্তির কর্মসূচিতে হামলা, যুব-ছাত্র সংঘর্ষ, হবিগঞ্জের সহিংসতা, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও রোগ একই। আজ কোনো বিরোধী দল সরকারকে দ্রুত সরানোর মতো শক্তিশালী নয়; কিন্তু নিজের দলের বেপরোয়া কর্মীরাই এ পরিস্থিতি তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলের দুই ধরনের মানুষ সামনে আসে, যারা নির্যাতিত এবং যারা কেবল ক্ষমতায় ফেরার অপেক্ষা করেছে। দ্বিতীয় দলটি এখন বহু জেলায় চোখে পড়ছে। তারা কমিটিতে ভাগ বসায়, জমির বিরোধ মেটানোর নামে অর্থ নেয়, টেন্ডার-ঠিকাদারিতে প্রভাব বিস্তার করে, দুর্বল মানুষকে ভয় দেখায়। এরাই ঘুণপোকা। তারা বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সাধারণ মানুষের চোখে রুক্ষ, অসহিষ্ণু দলের ছবি তৈরি করছে, যা প্রধানমন্ত্রীর নিজের আচরণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রয়োজন স্পষ্ট জাতীয় দলীয় মানদণ্ড, যা সবার ক্ষেত্রে সমান ও প্রকাশ্যে প্রয়োগ হবে। কোনো নেতার অনুসারীরা প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে হামলা করলে, চাঁদা নিলে বা জবরদস্তি চালালে সেই নেতার সাংগঠনিক পদ এক সপ্তাহের মধ্যে চলে যাবে। কেন্দ্র থেকেই সিদ্ধান্ত আসতে হবে। বিএনপি অতীতে এ ধরনের ব্যর্থতার মূল্য ভোটের বাক্সে দিয়েছে। জনগণ একই ভুল দ্বিতীয়বার সহজে ক্ষমা করবে না।
মন্ত্রণালয়ের আগে থানাগুলো ঠিক করুন। প্রশাসন ও পুলিশের কিছু অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রয়েছে, এমন ধারণা ছড়াচ্ছে। জবাব কোনো গণশুদ্ধি অভিযান হতে পারে না। সমাধান হলো মূল্যায়ন ও জবাবদিহি। প্রতি তিন মাসে জেলা অনুযায়ী চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, সংঘবদ্ধ সহিংসতা, মামলা নিষ্পত্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ সূচক প্রকাশ করুন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কর্মদক্ষতা সেই ফলাফলের ভিত্তিতে নামসহ মূল্যায়িত হোক। প্রতি দুই মাসে টাউন হল মিটিং বাধ্যতামূলক করুন, যেখানে তারা সাধারণ নাগরিকদের মুখোমুখি হতে হবে। সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের মুখ হলো থানা। অতীতের নির্যাতন, গুম, হত্যা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার হতে হবে শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ও আইনি শৃঙ্খলা মেনে। তড়িঘড়ি দুর্বল মামলা, পরে আপিলে ভেঙে পড়লে অভিযুক্তকে রাজনৈতিক শহীদে পরিণত করতে পারে। বিচারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার টিকে থাকার ক্ষমতা।
মানুষের কাছে অর্থনীতিই সবচেয়ে দৃশ্যমান সংস্কার। সাংবিধানিক সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সাধারণ মানুষ সরকারকে বিচার করেন বাজারে-চালের দাম, চাকরি, বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস, ব্যবসা করা সহজ হয়েছে কি না। জ্বালানি চুক্তির স্বচ্ছতা, বন্দরের দক্ষতা, তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসা পরিচালনার বাস্তব ব্যয় কমানো অনেক সাংবিধানিক সংশোধনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মসম্মান, দূরত্ব কমানো এবং ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনা জরুরি। ভারত সফরে না যাওয়া একটি অবস্থান হতে পারে, যতদিন না ভারত বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসাবে মেনে নেয়। সম্পর্ক পারস্পরিকতার ভিত্তিতে হতে হবে-পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, অশুল্ক বাণিজ্য বাধা, ট্রানজিটের শর্ত এবং অমীমাংসিত জবাবদিহির প্রশ্ন স্পষ্ট করতে হবে। বাংলাদেশ একটি ঘেরাও দেশ; দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারতের প্রভাবের বাইরে নয়। তাই মিয়ানমার হয়ে পূর্বমুখী বিকল্প পথ এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অপরিহার্য; তবে অবশ্যই পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে। মালয়েশিয়া, তুরস্ক, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করা যৌক্তিক। কিন্তু এক নির্ভরশীলতা থেকে আরেক নির্ভরশীলতায় ঢোকা কৌশলগত স্বাধীনতা নয়। আমাদের কৌশলগত মিত্রের বড়ই প্রয়োজন; বিপদ বলে-কয়ে আসে না।
যে সংস্কার এখনো কোনো সরকার সত্যিকার অর্থে করেনি, তা হলো শিক্ষাব্যবস্থা। পঞ্চান্ন বছর ধরে দক্ষতার চেয়ে সনদ বেশি তৈরি হয়েছে। স্কুলশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকতার মানে সত্যিকার পরিবর্তন এলে তার প্রভাব কয়েক প্রজন্ম টিকবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার বাস্তব প্রতিষ্ঠান দরকার, যেখানে ভবিষ্যতের নেতা শুধু পারিবারিক উত্তরাধিকার বা রাস্তার শক্তি দিয়ে তৈরি হবেন না; রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আইন, ইতিহাস, কূটনীতি ও জনপরিচালনার প্রশিক্ষণ পাবেন। জুলাইয়ের তরুণ শক্তিকে শত্রু নয়, নতুন প্রজন্ম হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করুন। তরুণরা আপনার শত্রু নয়; আপনিই তাদের প্রতীক।
আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্যর্থ হতে দেব না। সর্বশক্তি দিয়ে আমরা আছি আপনার পাশে। কিন্তু তাকে নিজের চারপাশের মানুষ, দলীয় শৃঙ্খলার অভাব, প্রশাসনিক জড়তা বা সংস্কারের ধীরগতি দিয়ে নিজের নেতৃত্বকে ব্যর্থ হতে দেওয়া চলবে না। বাংলাদেশের সামনে সময় নষ্ট করার সুযোগ খুব কম। দেশ ঠিক করতে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ সম্ভবত একেবারেই নেই। বিগত পাঁচ দশকের মধ্যে এটাই শ্রেষ্ঠ সুযোগ। অসফল হলে আমরা আবার গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আর কোনো সময় নষ্ট নয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম জিয়াউল হাসান, আরসিডিএস, পিএসসি : রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলবিষয়ক বিশ্লেষক
