Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

আমেরিকায় দ্রব্যমূল্য বাড়লেও সবাই কেন চুপ থাকে

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি পেলে, এমনকি তা যদি খাদ্যমূল্যও হয়, তাহলেও সাধারণভাবে বোঝার উপায় নেই, বাজারে আগুন লেগেছে। গণমাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তেমন প্রচার নেই, রাজনৈতিক দল হোক বা অন্য কোনো সংগঠন, তারা মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সোচ্চার হয় না। এ নিয়ে কোনো মিছিল নেই, অনশন নেই। মানুষের মধ্যে তাই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে, তা জানার কোনো উপায় থাকে না। তবে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে কিছুটা আলোচনা হয়। যেমন হয়েছে গত ফেব্রুয়ারির শেষদিক থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিভিন্ন দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি হয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার কারণে। যেসব দেশে তেল শোধনাগার আছে, অপরিশোধিত তেল সরবরাহে ঘাটতির কারণে প্রায় সর্বত্র সেগুলোর তেল শোধনের মাত্রা সংকুচিত হয়েছে। সর্বত্র জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম ছিল গ্যালন প্রতি ২.৯১ ডলার। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৪.১৮ ডলারে। গত জুনে প্রতি গ্যালন তেলের দাম উঠেছিল ৪.৬১ ডলারে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির স্বাভাবিক পরিণতি হচ্ছে পরিবহণ ব্যয়বৃদ্ধি এবং ভোক্তা পর্যায়ে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। ২০২১ সালকে যদি ভিত্তি বছর ধরা হয়, তাহলে তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সামগ্রিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত।

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে ভোগ্যপণ্যের মূল্য যেভাবে বাড়তে শুরু করেছিল, তাতে ধারণা করা হয়েছিল, এটি একটি সাময়িক ব্যাপার; মহামারি শেষ হলেই ভোগ্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে। কিন্তু মহামারি কেটে গেলেও পণ্যমূল্য আদৌ হ্রাস পায়নি, বরং আরও বেড়েছে। চলতি বছরের গোড়ার দিকে ইরানের ওপর হামলার পর সৃষ্ট সংকটে মূল্যস্তর আরেক দফা বেড়েছে এবং সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নজিরবিহীন চাপ পড়েছে। প্রতিটি স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবার তাদের খাদ্য বাজেট সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল খাদ্য প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির হার ছিল ন্যূনতম, বার্ষিক বৃদ্ধিহার ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে, যাকে স্থিতিশীল বলা চলে। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত খাদ্যমূল্য পূর্ববর্তী ৪০ বছরের চেয়ে অনেক বেশি হারে বেড়েছিল। তবে এরপর থেকে প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। নিুবিত্ত আমেরিকানরা, যারা বিভিন্ন ধরনের সরকারি খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকেন, তারা পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারছেন না। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর সব ধরনের মাংসের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। ডিমের দাম বেড়েছিল সবচেয়ে বেশি, ৩০০ শতাংশেরও বেশি। এর কারণ হিসাবে ফেডারেল খাদ্য প্রশাসন পোলট্রি খামারগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ‘এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’কে দায়ী করেছে। বর্তমানে ডিমের দাম স্থিতিশীল পর্যায়ে থাকলেও গরু ও খাসির মাংসের দাম করোনা মহামারির মাঝামাঝি সময়ের মূল্যের চেয়েও বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালের মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। গ্রোসারিতে রন্ধন-পূর্ব তাজা খাদ্যের দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বেড়েছিল রেস্টুরেন্টে পরিবেশিত সব ধরনের খাদ্যের দাম। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেও খাদ্য ও ভোজ্যতেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভোজ্যতেলের বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছিল, যা পরে কাটিয়ে উঠেছে। তবে ইরানযুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহের ঘাটতিজনিত প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংস, মাছ ও সামুদ্রিক খাবার, সবজি, তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, চিনি ইত্যাদির মূল্য গত ২০ বছরের গড় মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের শুরুর দিকের চেয়ে গরুর মাংসের মূল্য বেড়েছে ১৪.৬ শতাংশ। এর কারণ হিসাবে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে পশুখাদ্যের উচ্চমূল্যের কথা বলা হয়েছে। গবাদিপশুর উৎপাদনও কম ছিল বলে মাংসের সরবরাহ হ্রাস পাওয়াও তা মাংসের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা বছরের আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। ডিম ও দুধের মতো পণ্যের মূল্যও বাড়বে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল খাদ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা। দুধের দাম এ বছরের শেষ নাগাদ বর্তমান মূল্যের চেয়ে ২১ শতাংশ এবং সবজির মূল্য বর্তমান মূল্যের চেয়ে ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র গম-উদ্বৃত্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও খামার স্তরে গমের দাম অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশি এবং এ বছরের শেষ নাগাদ গমের মূল্য ২৫.১ শতাংশ বাড়তে পারে। মূল্যবৃদ্ধির এসব সূচক গবেষকদের কাজে লাগে, আমেরিকানরা সাধারণভাবে এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না।

তবে খাদ্যমূল্য বাড়লেই কোনো আমেরিকান বা বৈধ-অবৈধ যে কোনো স্ট্যাটাসের অভিবাসীকে ক্ষুধার্ত কাটাতে হবে, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এত ব্যাপক যে, কারও যদি খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনে তার বাড়িতে খাবার ও খাবার প্রস্তুত করার সব উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রবীণ ব্যক্তি, যাদের পরিবারে আর্থিক সংগতি নেই এবং তাদের সোশ্যাল সিকিউরিটি বেনিফিটের পরিমাণ যদি যৎসামান্য হয়, তাহলে ফেডারেল সরকার তাদের প্রতি মাসে সোশ্যাল সিকিউরিটি ইন্স্যুরেন্সের আওতাভুক্ত করে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। বড় বড় সিটিতে সিটি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। এছাড়া বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও চার্চ পরিচালিত খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বহু লোক তাদের পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া সুলভ মূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে অথবা বিনামূল্যে খাবার পরিবেশনের প্রতিষ্ঠানের কোনো অভাব নেই যুক্তরাষ্ট্রে। বড় বড় শহরে দরিদ্র মানুষের জন্য সুবিধা আরও বেশি।

নিউইয়র্ক মহানগরীতে খাওয়ার জায়গা খুঁজে পেতে কারও অসুবিধা হয় না। প্রায় ৯০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত নিউইয়র্কে প্রায় ২০ হাজার ছোট-বড়, ব্যয়বহুল এবং সুলভ মূল্যের রেস্টুরেন্ট আছে। এর বাইরে ফুটপাতে নগর কর্তৃপক্ষের অনুমতিপ্রাপ্ত ফুড ভেন্ডরও আছে। ব্যয়বহুল রেস্টুরেন্টগুলোতে বিত্তবানদের ভিড়, মূল্য তাদের কাছে কোনো ফ্যাক্টর নয়।

সুলভে খাওয়ার জন্য নিউইয়র্কের সর্বত্র আছে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট। সাত-আট ডলারে বিরিয়ানি পাওয়া সম্ভব অনেক রেস্টুরেন্টে। ‘জায়েরো’ নামের একটি সুলভ খাদ্যও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফুটপাতের ভ্যানগুলো থেকে কেউ ভরপেট খাবার খেতে পারেন মাত্র ছয় ডলারে। ফুটপাতের খাবারেও কোনো ভেজাল নেই। নগর প্রশাসনের খাদ্য পরিদর্শন বিভাগ এ ব্যাপারে কঠোর। কোনো বিক্রেতা বাসি বা ভেজাল খাবার বিক্রি করছে প্রমাণিত হলে বা কেউ খাবার খেয়ে অভিযোগ করলে ন্যূনতম জরিমানা ২০০ ডলার টিকিট। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জেল-জরিমানাসহ পারমিট বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে।

নিউইয়র্কে কেউ যদি মনে করেন, খাবারের পেছনে একটি ডলারও খরচ করবেন না, তাদের জন্যও ব্যবস্থা আছে। নগরীর নির্দিষ্ট জায়গায় নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি ভ্যান হাজির হয়, সঙ্গে কিছু লোক। তারা প্যাকেট খাবার, পানির বোতল বিতরণ করে। কিছু লোক আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকে, অন্যরা এসে যোগ দেয়। আমেরিকায় পরিধেয় পোশাক দেখে বোঝা যায় না কে ক্ষুধার্ত বা অভাবে আছে। এ খাবারও তাই। কারও জন্য নির্দিষ্ট নয়। যারা আগ্রহী, তারাই নেয়। কেউ খাবারের জন্য হুড়োহুড়ি করে না। লোকসংখ্যার চেয়ে খাবারের প্যাকেট যেহেতু বেশিই থাকে, অনেকে একাধিক প্যাকেটও নেয়। কেউ জানে না, কে বা কারা বছরজুড়ে তুষারপাত, বৃষ্টি উপেক্ষা করে এ খাবার সরবরাহ করছেন। দাতার মহিমা প্রচারের জন্য কোনো ব্যানার নেই, খাবার বয়ে আনা গাড়িতে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা নেই। যারা বিতরণ করছেন, তারাও কখনো বলেন না। হাসিমুখে কাজ সেরে তারা চলে যান। আয়হীন অথবা নিুআয়ের যারা বাড়িতে খাবার তৈরি করে খেতে অভ্যস্ত, তারা নিউইয়র্ক সিটিজুড়ে থাকা প্রায় আটশ ফুড প্যান্ট্রি থেকে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে তাজা সবজি, চাল, ডাল, ডিম, মাংস, মাছ, দুধ, ফল এবং ক্যান করা খাবার সংগ্রহ করতে পারেন।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .