Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

অবাধ্য নোনাজলে বজায় থাকুক প্রশান্তির সুর

Icon

খালিদ বিন আনিস

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অবাধ্য নোনাজলে বজায় থাকুক প্রশান্তির সুর

প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধন যেখানে সবচেয়ে গভীর, আবার একইসঙ্গে সবচেয়ে সংবেদনশীল, তা হলো বিশ্ব ঐতিহ্য আমাদের সুন্দরবন। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা প্রাচীর এই ম্যানগ্রোভ বনটি মূলত আমাদের পুরো উপকূলের জীবনের স্পন্দনও। ঝড়ো হাওয়াই হোক কিংবা ভয়াল জলোচ্ছ্বাস, যুগ যুগ ধরে নিজের বুক আগলে ধরে এ বন কোটি কোটি মানুষকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে আসছে।

বাওয়ালি, জেলে, আর মৌয়াল-এ তিন খেটে খাওয়া শ্রেণির পেশাজীবীদের রক্ত ও ঘামের ওপর ভর করে টিকে আছে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রান্তীয় অর্থনীতি। বনের সঙ্গে মানুষের এ আত্মিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন এতটাই সুগভীর যে, সুন্দরবন শান্ত থাকলে উপকূলের বাতাস শান্ত থাকে; আর বন সুরক্ষিত থাকলে বেঁচে থাকে হাজার হাজার মানুষের নিত্যজীবন।

সুন্দরবনের মানুষের জীবনযাত্রার গল্পটি যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। গহিন বন আর বিস্তৃত খাড়ির নোনাজলে জীবন বাজি রেখে কাজ করাই যাদের ভাগ্য, তাদের প্রতিমুহূর্তেই লড়তে হয় প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে। কিন্তু প্রকৃতির চেয়েও বিষাক্ত ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায় মানুষেরই তৈরি আতঙ্ক-জলদস্যু ও বনদস্যু বাহিনী। বিগত দিনে এ অঞ্চলকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগে সুন্দরবনের নির্জন ও দুর্গম অঞ্চলে দস্যু বাহিনীগুলো আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ট্রলার আটকে ডাকাতি, বনজীবীদের অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি রাখা, পরিবারগুলোর কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি-এমন ভয়াবহ অপরাধের ঘটনা হঠাৎ করেই আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। দিন এনে দিন খাওয়া নিরীহ মানুষের জন্য এ দুরবস্থা আসলেই এক বিশাল ট্র্যাজেডি।

প্রান্তিক এ মানুষের চরম ক্রান্তিলগ্নে বরাবরের মতোই প্রহরীর ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সুন্দরবনের মতো দুর্গম, বিশাল এবং খাড়িভরা বনে অপরাধ দমন করা যে কোনো বাহিনীর জন্যই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এখানকার নদীগুলো যেমন আঁকাবাঁকা, তেমনি বনের ভেতরের এলাকাগুলো জলদস্যুদের লুকানোর জন্য আদর্শ জায়গাও বটে। তবে এ দুর্গমতাকে উপেক্ষা করে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা গ্রহণ করে গোয়েন্দাভিত্তিক বিশেষ কৌশলী অবস্থান। নিয়মিত নদীর বুকে টহল দেওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের অতি-সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে চালু করা হয়েছে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি। বিশেষ করে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এ দুটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান বনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। উপকূলীয় জলসীমায় নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুতগতির বোট এবং অদম্য সাহসিকতাকে কাজে লাগিয়ে কোস্ট গার্ডের আভিযানিক দলগুলো দস্যুদের গোপন আস্তানায় সরাসরি হানা দেয়। পোলভিত্তিক বিশেষ টহল ও ঝটিকা অভিযানের ফলে স্বাভাবিকভাবেই দস্যুদের যোগাযোগের পথ এবং চলাচলের নেটওয়ার্ক একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

কোস্ট গার্ডের এই দীর্ঘ ও পেশাদার অভিযানের সুফল মিলতেও বেশি সময় লাগেনি। একের পর এক কুখ্যাত জলদস্যু ও তাদের সহযোগীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় বাহিনীটি। অভিযান চলাকালে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়, যা দস্যু বাহিনীগুলোর হিংস্র সক্ষমতাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। নথি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট ৪৫ জন দুর্ধর্ষ বনদস্যুকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে কোনো অভিযানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা ধরা পড়ে যখন কোনো নিরীহ মানুষের প্রাণ বাঁচে। কোস্ট গার্ডের এই টানা অভিযানে দস্যুদের হাত থেকে জিম্মি অবস্থায় থাকা ৪২ জনকে (সাধারণ বনজীবী, পর্যটক এবং হোটেল মালিক) জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যারা গহিন বনের অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, পরিবার হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন, তাদের আবার প্রিয়জনদের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার এ দৃশ্যটি ছিল অতি মানবিক ও আনন্দঘন।

একের পর এক যৌথ ও বিশেষ অভিযানের মুখে পড়ে দস্যু বাহিনীগুলোর মনোবল ভেঙে যায় এবং তাদের সর্দাররা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সুন্দরবনের জল ও ডাঙ্গা থেকে সন্ত্রাসের ছায়া আবার কাটতে শুরু করে। সুন্দরবনের নদী-খাড়িতে এখন কোস্ট গার্ডের সাদা জাহাজ ও স্পিডবোটের নিয়মিত উপস্থিতি চোখে পড়ে। এ দৃশ্য শুধু অপরাধীদের জন্যই সতর্কবার্তা নয়, বরং বনজীবীদের জন্য এক পরম আস্থার প্রতীক। আজ বাওয়ালিরা নির্ভয়ে গাছে উঠছেন, জেলেরা মাঝনদীতে জাল ফেলছেন আর মৌয়ালরা খুশিমনে মধু সংগ্রহ করতে বনের গভীরে পা বাড়াচ্ছেন।

তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সুন্দরবনের স্থায়ী নিরাপত্তা একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো একটি একক বাহিনীর পক্ষে এত বিশাল একটি ম্যানগ্রোভ বনকে সারা জীবন একা পাহারা দিয়ে রাখা কঠিন। কোস্ট গার্ড তাদের অসীম পেশাদারত্ব দিয়ে শান্তির একটি মজবুত ভিত তৈরি করে দিয়েছে সন্দেহ নেই; কিন্তু এ শান্ত পরিবেশকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে প্রয়োজন এক সর্বাত্মক ও সমন্বিত উদ্যোগ।

বনজীবী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা : বনের খবর সবচেয়ে ভালো জানেন স্থানীয় জেলেরাই। তাদের নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ করে গোয়েন্দা তথ্যের সহযোগী হিসাবে যুক্ত রাখতে হবে।

প্রশাসনের সমন্বয় : কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, নৌবাহিনী এবং বন বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ আন্তঃসংস্থা সমন্বয় যত জোরদার হবে, অপরাধীদের পুনরুত্থানের সুযোগ তত কমবে।

বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন : যেসব দস্যু আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এনে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুনির্দিষ্ট সুযোগ দিতে হবে, যেন অভাবে পড়ে কেউ আবার অপরাধের পথে পা না বাড়ায়।

সুন্দরবন আমাদের শুধু অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মার একটি অংশ। একে রক্ষা করার অর্থ হলো লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। কোস্ট গার্ডের নিরলস তৎপরতা ও সাহসিকতায় যে স্বস্তির সুবাতাস আজ সুন্দরবনে বইতে শুরু করেছে, তাকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে সযত্নে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সমাজ এবং উপকূলের সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসই পারে জলদস্যুমুক্ত এক নতুন ও নিরাপদ সুন্দরবন উপহার দিতে। নিরাপদ থাকুক আমাদের বনের সীমানা, নিরাপদ থাকুক এ অঞ্চলের মেহনতি মানুষের জীবন। আর তা নিশ্চিতে পাশে থাকুক ‘গার্ডিয়ান অব দ্য সি’ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।

খালিদ বিন আনিস : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম