সামরিক বাহিনী জাতীয় শক্তির একটি উপাদান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সম্মান, সততা, আনুগত্য, দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার, সাহস ও আত্মত্যাগের মতো মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়ে সেনাবাহিনী জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সামরিক প্রতিষ্ঠানকে ধারণ করার জন্য আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং এর সদস্যদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ২২টি দেশে সামরিক বাহিনীতে ৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে পথচলা এবং প্রায় ১৫০টি দেশের মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে একজন ‘বাংলাদেশী সৈনিক’ হিসাবে পরিচিত হওয়ার সম্মান ও সৌভাগ্য দিয়েছে।
সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যকার বন্ধন জাতীয় নিরাপত্তা, শান্তি ও উন্নয়নের জন্য একটি যৌথ দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জনগণের সেনাবাহিনী হিসাবে এটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানানোর পাশাপাশি যে কোনো হুমকির বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকে। এর বিনিময়ে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা, আইনের শাসন সমুন্নত রাখা এবং জাতীয় সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক অবদান রাখা উচিত। জাতির নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি হলো সম্মিলিত দায়িত্ব, যার জন্য জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। যে কোনো অস্বাভাবিকতা, সন্দেহজনক কার্যকলাপ, অপতথ্য বা জাতীয় স্বার্থের প্রতি হুমকির বিষয়ে আইনসম্মত চ্যানেলের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো উচিত, যাতে সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। ঐক্যবদ্ধ জনগণ একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর নৈতিক ভিত্তি প্রদান করে, অন্যদিকে একটি পেশাদার ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী জাতির নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। কাজেই নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে স্থায়ী অংশীদারত্ব অপরিহার্য।
বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখা অন্যতম প্রধান দেশ। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কর্মদক্ষতা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে উন্নত করেছে। বাংলাদেশের অবদানের গভীর স্বীকৃতি এ ঘটনায় প্রতিফলিত হয় যে, সিয়েরা লিওনে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণ এবং এর শান্তিরক্ষীদের সেবাপ্রাপ্তদের মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতীক।
সেনাবাহিনী একটি পেশাদার এবং কঠোর কমান্ড শৃঙ্খলের মাধ্যমে কাজ করে। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সামরিক বাহিনীর মতো আমাদের সেনাবাহিনীও সরকারের আইনসম্মত কর্তৃত্বের অধীনে কাজ করে এবং সংবিধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ মনোনীত বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থাকে। এটি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, তারা রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী বা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মতো নয়, সামরিক কর্মীরা সাধারণত নিজেদের আড়ালে রাখেন। অনেক অফিসার ও সৈনিক স্বভাবতই সংরক্ষিত থাকেন এবং তাদের পেশাগত দায়িত্বের ওপর নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করেন। সামরিক সংস্কৃতিতে অতিরিক্ত আত্মপ্রচারকে প্রায়ই নিরুৎসাহিত করা হয়, কারণ প্রচারের চেয়ে কর্তব্য, শৃঙ্খলা ও কর্মক্ষমতাকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ, সেনাবাহিনীর অনেক অর্জন বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে অজানা থেকে যায়।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক বাহিনী সম্পর্কে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ যুগে তথ্য দ্রুত ছড়ায়; কিন্তু ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়ায়। নাগরিকদের তাই যাচাইবিহীন দাবি ও বয়ান সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত, যাতে অসাধুরা দেশের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে না পারে। গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য; কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য, বিদ্বেষপূর্ণ গুজব এবং প্রমাণ ছাড়া জনআস্থা নষ্ট করার চেষ্টা জাতীয় সংহতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং জাতীয় লক্ষ্য ও স্বার্থ অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ ধরনের বিষয়গুলো অবশ্যই সেই সৈন্যদের মনোবল কমিয়ে দেয়, যারা কঠোর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং কঠোর রেজিমেন্টাল জীবনযাপন করেছেন, শুধু দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য। সেনাবাহিনীতে বেশির ভাগ বিষয়ই ‘জানার প্রয়োজন’ (Need to Know) নীতি অনুসরণ করে বিভক্ত করে রাখা হয়। প্রকৃতপক্ষে, আমি যেমনটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি, যে কোনো ভুল তথ্য, এমনকি প্রচারণার উৎস কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি হতে পারেন না। অতএব, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নাগরিক ও গণমাধ্যমের জন্য এমন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনা করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা বিচক্ষণতার কাজ হবে, যাদের প্রবেশাধিকার, পদ বা দায়িত্বের কারণে বিষয়টি সম্পর্কে তাদের সরাসরি জ্ঞান থাকার সুযোগ না-ও থাকতে পারে। পরিশেষে, আমি পাঠকদের বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, তারা যেন অনির্ভরযোগ্য বা যাচাইবিহীন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি আমাদের প্রিয় সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখেন। কারণ একজন পেশাদার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিক, একজন সৎ নাগরিক হিসাবে, যথাযথ কমান্ড চেইনের মাধ্যমে রিপোর্ট করবেন এবং সংস্থার মর্যাদা ও বৈধ গোপনীয়তা রক্ষা করবেন-এমনটি আশা করা হয়। দেশের সেবা করার জন্য সেনাবাহিনীতে এটাই আমাদের প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণার ভিত্তি। অতএব, এমন কর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গণমাধ্যম/ব্যক্তিদেরও উচিত মনগড়া ও আংশিক-সত্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করার আগে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্টীকরণ চাইতে পারে এবং আমরা আগেও তা করেছি, যখন সেনা সদরদপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন আমাকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক কাজ করতে হয়েছিল। অতীতে আমরা যে পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলাম, তা সম্ভবত কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে বা আমাদের প্রিয় সৈন্যদের মনোবলকে অহেতুকভাবে প্রভাবিত না করে দেশের জন্য আরও ভালো ফল বয়ে এনেছিল। আসুন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা আবারও তা-ই করি এবং সর্বোত্তম ফলাফলের আশা রাখি।
আব্দুল্লাহ আল মামুন, পিএইচডি : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, বর্তমানে এমআইএসটি-তে খণ্ডকালীন প্রফেসর

