Logo
Logo
×
   

বাতায়ন

সংঘাতের মূলে ধর্ম নয়, রাজনীতির হিসাব

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংঘাতের মূলে ধর্ম নয়, রাজনীতির হিসাব

একুশ শতকের বিশ্বরাজনীতি ও গণমাধ্যমের শিরোনাম পর্যালোচনা করলে মনে হয়, আধুনিক বিশ্বের মূল সংঘাত ও অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসলাম ধর্ম এবং পশ্চিমের সঙ্গে এর সাংস্কৃতিক বৈরিতা। পাশ্চাত্যের মিডিয়ার প্রচারণা দেখে মনে হবে, পানি আর তেল যেমন মেশে না, ইসলামও আধুনিক বিশ্বে খাপ খাওয়ার মতো নয়। ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এমন প্রেক্ষাপটেই স্যামুয়েল হান্টিংটনের বহুল আলোচিত ‘সভ্যতার সংঘাত’ (Clash of Civilizations) তত্ত্ব যেন ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বে এক চিরন্তন সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিল। কিন্তু এর বাস্তবতা কতটুকু? সপ্তম শতকে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব যদি না ঘটত, তবে এখনকার দুনিয়া কেমন হতো? যদি মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) আবির্ভাব ছাড়াই ইতিহাসের চাকা চলতে শুরু করত, তবে কি আজকের মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিরাজ করত? পশ্চিম ও প্রাচ্যের সম্পর্কে কি কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাত থাকত না? ইসলামের আবির্ভাবের আগে কি বিশ্ব শান্তিপূর্ণ ছিল? এমনসব প্রশ্ন উত্থাপন এবং জবাব নিয়েই হাজির হয়েছেন গ্রাহাম ই. ফুলার।

ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড উইদাউট ইসলাম’ (A World Without Islam) গ্রন্থটির শিরোনাম দেখলে মনে হতে পারে ইসলামবিরোধী কোনো রচনা। কিন্তু গ্রন্থটি পড়লে বোঝা যায়, লেখক আসলে ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো বাতিল করার চেষ্টা করেছেন। ইসলাম নিয়ে পাশ্চাত্যের ওই ভুল ধারণা তিনি ভেঙে দিতে চেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এমনকি ইসলাম না থাকলেও পৃথিবীতে সংঘাত থাকতই। কারণ সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি হলো ভূরাজনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার লড়াই। ধর্ম এখানে কেবল বাহ্যিক প্রতীক বা ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি কাল্পনিক ঐতিহাসিক কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, যদি ইসলাম ধর্ম কখনো অস্তিত্বশীল না-ও হতো, তবুও আজকের মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের স্বরূপ প্রায় একই থাকত। ফুলারের প্রধান যুক্তি হলো-পশ্চিম ও প্রাচ্যের বৈরিতা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের লড়াই নয়; এটি মূলত ভূমি, তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ, কৌশলগত সাম্রাজ্যবাদ এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের সংঘাত। ধর্ম এখানে কেবল সংঘাতের ব্যানার বা ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে, মূল কারণ হিসাবে নয়।

গ্রন্থটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রূপরেখা বিশ্লেষণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাইকস-পিকোট চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যেভাবে কৃত্রিম সীমান্ত এঁকে মধ্যপ্রাচ্যকে টুকরো টুকরো করেছে, ইউরোপের ইহুদিদের জড়ো করে ইসরাইল নামের একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে, স্বৈরশাসক বসিয়েছে এবং সম্পদ লুণ্ঠন করেছে-তাতে ইসলাম না থাকলেও আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করত।

ফুলার তার বইয়ে কয়েকটি স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইসলামের অনুপস্থিতির কাল্পনিক দৃশ্যপট আমাদের সামনে হাজির করেছেন।

ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত : এটি মূলত ভূমি ও জাতীয়তাবাদী বিরোধ, কোনো ধর্মীয় বিরোধ নয়। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রথম সারির বহু নেতা (যেমন : জর্জ হাবাশ, হান্নান আশরাউই) ছিলেন আরব খ্রিষ্টান। ইসলাম না থাকলেও ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এই একই যুদ্ধ অব্যাহত থাকত।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা : ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রধান কারণ ছিল তেলসম্পদের জাতীয়করণ। মোসাদ্দেক ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ নেতা। ফলে ইরানের সঙ্গে মার্কিন সংঘাতের মূল কারণ তেল ও সাম্রাজ্যবাদ, ইসলাম নয়। গ্রন্থটি লেখার অনেক পরে বর্তমানে যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ চলছে, সেখানেও ইসলাম-খ্রিষ্টান বিরোধ নয়, বরং তেলসম্পদ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটাই প্রধান বিষয়।

তেল ও কৌশলগত রুট : মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। এ অঞ্চলে যে ধর্ম বা মতাদর্শই থাকুক না কেন, পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে এখানে হস্তক্ষেপ করতই এবং স্থানীয় জনগণ তার প্রতিবাদ জানাত।

যখন কোনো সমাজ দীর্ঘকাল বিদেশি দখলদারত্ব ও স্বৈরাচারের শিকার হয়, তখন তারা প্রতিরোধের পথ খোঁজে। ২০ শতকের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্যে এ প্রতিরোধ ছিল ‘আরব সমাজতন্ত্র’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরাচারী শাসকদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির পর জনগণ তাদের আত্মপরিচয়ের শেষ আশ্রয় হিসাবে ‘ইসলাম’-কে রাজনৈতিক ভাষা ও প্রতিরোধের ব্যানার হিসাবে বেছে নেয়। যদি ইসলাম না থাকত, তবে এ প্রতিরোধ লাতিন আমেরিকার মতো ‘মার্সিবাদ’ বা ‘খ্রিষ্টান মুক্তি ধর্মতত্ত্বে’র রূপ নিত।

গ্রন্থটিকে লেখক মূলত তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পর্বে বিভক্ত করে আলোচনা করেছেন :

(ক) ইসলামপূর্ব মধ্যপ্রাচ্য ও রোমান-বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য

ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় জাতিগুলোর সঙ্গে ক্যাথলিক রোম ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাত বিদ্যমান ছিল। লেখক দেখান, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্মকে যখন রাষ্ট্রীয় ধর্ম করা হয়, তখন সিরিয়া, মিশর ও মেসোপটেমিয়ার স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলো (যেমন : নেস্টোরিয়ান ও মনোফাইসিট খ্রিষ্টান) কনস্টান্টিনোপলের ধর্মীয় আধিপত্য ও চরম কর-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। ইসলাম যখন এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এখানকার স্থানীয় খ্রিষ্টানরা বাইজেন্টাইন শাসনের কঠোরতা থেকে বাঁচতে মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানিয়েছিল। ফুলার যুক্তি দেন, ইসলাম না থাকলেও এসব পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ইউরোপীয় রোমান/ক্যাথলিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য একইভাবে লড়াই করে যেত।

(খ) উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্য ও ইউরোপীয় শক্তির দ্বন্দ্ব

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধগুলোকে সচরাচর খ্রিষ্টান ও মুসলিম দুনিয়ার লড়াই বলা হলেও ফুলার এর পেছনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ প্রকাশ করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ১২০৪ সালের চতুর্থ ক্রুসেডে ইউরোপীয় ক্যাথলিক ক্রুসেডাররা জেরুসালেমে না গিয়ে কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ চালিয়ে অর্থোডক্স খ্রিষ্টানদেরই হত্যা ও লুটের শিকার বানিয়েছিল। একইভাবে, উসমানীয়দের ইউরোপ অভিমুখে সম্প্রসারণ কোনো ধর্মান্তরকরণের অভিযান ছিল না, বরং তা ছিল একটি উদীয়মান এশীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সীমানা বৃদ্ধি। যদি তুর্কিরা ইসলাম গ্রহণ না-ও করত, তবুও মধ্য এশিয়ান বা তুর্কি জাতি হিসাবে ইউরোপের ভূখণ্ড দখলের তাদের এ যুদ্ধ একইভাবে সংঘটিত হতো।

(গ) আধুনিক যুগ : ঔপনিবেশিকতা, তেল ও মার্কিন হস্তক্ষেপ

ইতিহাস, ভূরাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব এবং ইসলাম ও পশ্চিমের বৈরিতার প্রকৃত উৎস বিশ্লেষণে ফুলারের সিআইএ-জীবনের অভিজ্ঞতা বইটিকে গভীরতা দিয়েছে। তিনি পশ্চিমা পাঠকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন যে, ইসলামকে ‘শত্রু’ হিসাবে দেখা ভুল। বরং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের উচিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা।

তিনি বলেন, ইসলাম না থাকলেও বাইজেন্টাইন-রোমান দ্বন্দ্ব, রাশিয়া-ইউরোপ সংঘাত, ভারত-চীন-রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকতই। অর্থাৎ ইসলামকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। এমনকি ভবিষ্যতে ইসলাম না থাকলে আবারও খ্রিষ্টান-ইহুদি লড়াই শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। আর খ্রিষ্টান-ইহুদি সংঘাত কী ভয়াবহ ছিল, তা অজানা কোনো বিষয় নয়।

বইটিতে তিনি ইব্রাহামিক ধর্মগুলোর ধারাবাহিকতা তুলে ধরেছেন। ইসলাম, খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মের মধ্যে মিল ও পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ধর্মগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সংঘাতের মূল উৎস ধর্ম নয়। বরং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং অর্থনৈতিক স্বার্থই ইতিহাসে যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় প্রেক্ষাপটেও তিনি দেখান, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব আসলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। ধর্ম এখানে কেবল বাহ্যিক প্রতীক।

প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন, বাইজেন্টাইন-রোমান দ্বন্দ্ব, ক্রুসেড-সবই ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশিত হলেও আসলে রাজনৈতিক। ইসলাম আরব গোত্রগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, কিন্তু সংঘাতের মূল কারণ ছিল সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাভিলাষ।

বর্তমান সময়ে ইসলামিজমকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসাবে। আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন-সবখানেই ইসলাম রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে। তার মতে, ইসলামকে ‘শত্রু’ হিসাবে দেখা ভুল। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের উচিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা। ভারতীয় প্রেক্ষাপটেও তিনি দেখান, হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব আসলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক বৈষম্য ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। ধর্ম এখানে কেবল বাহ্যিক প্রতীক।

যদিও গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় ধারণাটি চমৎকার, তবুও কিছু দিক রয়েছে যেখানে এটি সমালোচনাযোগ্য :

১. সহজীকরণের ঝুঁকি

বইটির বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি অনেক সময় জটিল ধর্মীয় বিষয়গুলোকে অবমূল্যায়ন করে। ইসলাম কেবল একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের জীবনের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। ফুলার যখন সবকিছুকে শুধু ভূরাজনীতির চশমায় দেখেন, তখন তিনি ইসলামের নিজস্ব দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক আবেদনকে অনেকটাই আড়াল করে ফেলেন। মানুষের কাছে ধর্ম কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, বরং বিশ্বাসের জায়গা-এ দিকটি লেখক কিছুটা উপেক্ষা করেছেন।

২. একপাক্ষিক প্রবণতা

অনেকের মতে, ফুলার পশ্চিমা ত্রুটিগুলো দেখাতে গিয়ে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে কিছুটা লঘু করে দেখেছেন। মুসলিম দেশগুলোর দুর্নীতি, স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এবং আধুনিকায়নের প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলো যে শুধু পশ্চিমাদের কারণে হয়নি, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অথচ বইটি পড়লে মনে হতে পারে, সবকিছুর দায় যেন পশ্চিমাদের। এটি একটি ভারসাম্যহীন আলোচনার জন্ম দেয়।

৩. কাল্পনিক মডেলের সীমাবদ্ধতা

‘ইসলাম না থাকলে কী হতো’-এ হাইপোথিসিসটি মজার হলেও তা মূলত অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইতিহাস একটি জৈব প্রক্রিয়া। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম ছিল না, এটি আরব উপদ্বীপের মানুষদের এক সুতোয় গেঁথেছিল এবং একটি নতুন বিশ্ব-সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। একে বাদ দিয়ে ইতিহাস কল্পনা করা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে তার প্রয়োগ ততটাই অস্পষ্ট।

আজকের বিশ্বে যেখানে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামবিদ্বেষ প্রকট, সেখানে ফুলারের এ বইটি একটি জরুরি কণ্ঠস্বর। বিশেষ করে ৯/১১-পরবর্তী সময়ে যখন ইসলামকে ‘সহিংসতার ধর্ম’ হিসাবে চিত্রিত করার প্রবণতা বেড়েছে, তখন ফুলারের যুক্তিগুলো আমাদের শেখায় যে, ঘৃণা আসলে ধর্মের কোনো সহজাত বিষয় নয়। এটি মূলত ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের ‘ধর্মীয় কাঠামোর’ বাইরে বেরিয়ে ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর’ দিকে তাকাতে হবে। যদি বিশ্ব থেকে ইসলাম মুছে ফেলা হতো, তবে আজকের দিনে হয়তো আমরা ‘আরব জাতীয়তাবাদ’ বনাম ‘পশ্চিমা আধিপত্যের’ লড়াই দেখতাম, যা বর্তমানের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন হতো না।

গ্রাহাম ফুলারের ‘এ ওয়ার্ল্ড উইদাউট ইসলাম’ একটি সাহসী ও চিন্তাশীল বই। গ্রন্থটি পশ্চিমা পাঠকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। ইসলামকে কেন্দ্র করে নীতি প্রণয়ন না করে বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা জরুরি। ইসলামকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপ, সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাই সংঘাতের মূল উৎস। গ্রন্থটি ইসলামকে দায়মুক্ত করে এবং পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। বইটি তাদের জন্য অপরিহার্য, যারা বিশ্ব রাজনীতিকে বুঝতে চান। এটি আমাদের শেখায় যে, কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা ধর্মকে ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করা আসলে সমস্যার মূল কারণকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি অজুহাত মাত্র।

তবে গ্রন্থটি পড়ার সময় পাঠকের সতর্কতা প্রয়োজন। লেখক যে নিরপেক্ষতার দাবি করেন, তার মধ্যেও তার নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক পক্ষপাত রয়েছে। একজন পাঠককে অবশ্যই গ্রন্থটি পড়ার পাশাপাশি অন্য ইতিহাসবেত্তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনা করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, বইটি মুসলিম এবং পশ্চিমা উভয় বিশ্বের মানুষের জন্য একটি আয়না, যেখানে তাকিয়ে তারা তাদের দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করার সুযোগ পাবেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের চাবিকাঠি ইসলামি সংস্কৃতি বা ধর্মকে পরিবর্তন করার মধ্যে নয়; বরং পশ্চিমাদের আধিপত্যবাদী নীতি পরিবর্তন, সাময়িক সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং স্থানীয় জনগণের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানোর ওপর নির্ভর করছে। চিন্তাশীল পাঠক, ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থীদের জন্য এ বইটি চিন্তার নতুন দরজা খুলে দেওয়ার এক অতুলনীয় মাস্টারপিস।

মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .