নারীরা কেন গোলাপি রঙে বেশি আকৃষ্ট, জানাল গবেষণা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
‘বার্বি’ সিনেমার প্রচারে ‘পিংক কার্পেট’ অনুষ্ঠানে ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছেন অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী মার্গারেট রুবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘ছেলেরা নীল আর মেয়েরা গোলাপি রঙ পছন্দ করে’—এমন ধারণা দীর্ঘদিনের। এবার গবেষণার মাধ্যমে সেই ধারণার পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন একদল গবেষক। তাদের মতে, রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে সত্যিই কিছু পার্থক্য রয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, এই পার্থক্যের পেছনে বিবর্তনগত কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে নারীদের লালচে বা গোলাপি রঙের প্রতি আকর্ষণ বিবর্তনের ধারায় তৈরি হয়ে থাকতে পারে। পাকা ফলের লালচে রঙ কিংবা সুস্থ মানুষের মুখের স্বাভাবিক লাল আভা শনাক্ত করার প্রয়োজন থেকেই এ ধরনের পছন্দের বিকাশ ঘটতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী আনিয়া হার্লবার্টের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য নিয়ে প্রথমদিকের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর একটি। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে।
কীভাবে গবেষণা করা হলো
গবেষণায় একদল নারী ও পুরুষকে অন্ধকার কক্ষে কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রায় ১ হাজার জোড়া বিভিন্ন রঙের আয়তক্ষেত্র দেখানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের প্রতিটি জোড়া থেকে তাদের পছন্দের রঙটি যত দ্রুত সম্ভব বেছে নিতে বলা হয়।
পরে গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের পছন্দের রঙগুলোকে রঙের বর্ণালির সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, পুরুষদের নীল রঙের প্রতি তুলনামূলক বেশি আকর্ষণ রয়েছে। অন্যদিকে নারীদের পছন্দও নীল রঙের দিকেই থাকলেও তা বর্ণালির গোলাপি ও লালচে অংশের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে।
হার্লবার্ট বলেন, নারীদের রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। হলুদ ও সবুজের প্রতি তাদের আকর্ষণ তুলনামূলক কম, কিন্তু বেগুনি থেকে লালচে অংশের দিকে পছন্দের মাত্রা বেড়ে যায়।
কেন গোলাপির প্রতি আকর্ষণ?
গবেষকদের মতে, মানুষের মধ্যে নীল রঙের প্রতি একটি সাধারণ বা প্রাকৃতিক আকর্ষণ আগে থেকেই থাকতে পারে। নারীদের গোলাপি বা লালচে রঙের প্রতি বাড়তি পছন্দ সেই নীলের স্বাভাবিক পছন্দের ওপর বিবর্তনের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে।-6a8578d451a00.jpg)
হার্লবার্টের ভাষায়, নীল ও লালচে রঙের এই পছন্দ একত্র করলে এমন রঙ পাওয়া যায়, যা অনেকটা ‘লিলাক’ বা গোলাপির কাছাকাছি।
তিনি মনে করেন, এর সঙ্গে মানুষের প্রাচীন জীবনযাপন ও কাজের বিভাজনের সম্পর্ক থাকতে পারে। প্রাগৈতিহাসিক সমাজে পুরুষেরা প্রধানত শিকার করতেন। ফলে শিকারের সময় রঙের সূক্ষ্ম পার্থক্য শনাক্ত করার প্রয়োজন তুলনামূলক কম ছিল; বরং দ্রুত কোনো গাঢ় বস্তু শনাক্ত করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে নারীরা খাদ্য সংগ্রহের কাজে বেশি যুক্ত থাকলে পাকা ফলের লালচে রঙ শনাক্ত করার ক্ষমতা তাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। একইভাবে সুস্থ মানুষের মুখে রক্তসঞ্চালনের কারণে তৈরি লালচে আভাও স্বাস্থ্য বোঝার একটি সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।
১৯৬০-এর দশক থেকে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা রঙের খেলনা তৈরিতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেয়েদের জন্য গোলাপি এবং ছেলেদের জন্য নীল রঙের খেলনা বেশি প্রচলিত হওয়ায় ধীরে ধীরে রঙের সঙ্গে লিঙ্গের সম্পর্ক তৈরি হয়। অভিভাবকেরাও এই প্রবণতা অনুসরণ করায় বিষয়টি সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের জামা, জুতো ও খেলনায় গোলাপি রঙের ব্যবহার তাদের পছন্দেও প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুরা চারপাশের পরিবেশ দেখে শেখে এবং অনুকরণ করে। ফলে পরিবার, সমাজ ও বাজারের প্রচলিত ধারণা তাদের রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের মতে, প্রায় দুই বছর বয়স থেকে মেয়েদের মধ্যে গোলাপির প্রতি ঝোঁক বাড়তে পারে, একই সময়ে ছেলেরা এ রঙ এড়িয়ে চলতে শুরু করে। তাই রঙের পছন্দ পুরোপুরি জন্মগত নয়; সামাজিক পরিবেশেরও প্রভাব রয়েছে। গোলাপি নিজে নারীদের কোনো নির্দিষ্ট রঙ নয়—এটি অন্য সব রঙের মতোই একটি রঙ, যা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ পছন্দ করতে পারেন।
দীর্ঘদিনের ধারণায় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
গবেষকদের এই ফলাফল ‘ছেলেরা নীল আর মেয়েরা গোলাপি পছন্দ করে’—এই প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের মধ্যে নীল রঙের প্রতি একটি সাধারণ পছন্দের কথা উঠে এলেও নারী-পুরুষের রঙ পছন্দে পার্থক্যের পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব বেশি ছিল না।
হার্লবার্টের মতে, নারীদের লালচে রঙের প্রতি আকর্ষণের পেছনে কেবল সামাজিক বা সাংস্কৃতিক প্রভাব নয়, মানুষের বিবর্তনগত ইতিহাসেরও ভূমিকা থাকতে পারে। তবে রঙ পছন্দের ক্ষেত্রে সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের প্রভাবও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
সূত্র: রয়টার্স
