Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

জলবায়ু পরিবর্তন: এশিয়ার করণীয় কী?

Icon

অনুবাদ: রাগিব শাহরিয়ার

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৪ এএম

জলবায়ু পরিবর্তন: এশিয়ার করণীয় কী?

ফাইল ছবি

জলবায়ু পরিবর্তন যতদিন প্রাসঙ্গিক, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে আলোচনা ততদিন জরুরি। এই অঞ্চলে চীন, জাপান এবং ভারতের মতো বৃহৎ রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই বড় আকারের গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদন করছে, শুধু তা-ই নয়, এই গ্যাসের প্রভাবে অপেক্ষাকৃত নিচু ভূখণ্ডগুলো পানি-সংশ্লিষ্ট নানান ঝুঁকির মধ্যে আছে। সম্প্রতি আমরা দেখেছি চীন এবং ভারতে বন্যায় অনেক ক্ষয়ক্ষতির নমুনা। 

দক্ষিণ কোরিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে পরপর দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম, কোরিয়া গ্লোবাল এডাপটেশান উইক ২০২৩ এবং অষ্টম এশিয়া প্যাসিফিক এডাপটেশান ফোরাম, সেখানেও কয়েক সপ্তাহ আগে বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা এত ছাপিয়েছে যে মাঝপথে একটা আন্তর্জাতিক স্কাউট জাম্বুরি বাতিল করতে হয়েছে, সেই সাথে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত হাজার হাজার অংশগ্রহণকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিলো। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভোগ করলেও কোরিয়া হাত গুটিয়ে বসে নেই।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর দৌড়ে কোরিয়া এখন পৃথিবীর অন্যতম একটি রাষ্ট্র। নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষত সমুদ্র-উপকূলীয় বায়ু শক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে কোরিয়া। কয়েক বছর আগে কোরিয়া একটি অভিযোজন সংস্থা (এডাপটেশন এজেন্সি) খোলে এবং সেই থেকে তাদের সব প্রশাসনিক ইউনিটে স্থানীয় নেতৃত্বভিত্তিক অভিযোজন পরিকল্পনা (locally-led adaptation plans) প্রণয়ন করছে। এসবের বাইরে কোরিয়া বাৎসরিক গ্লোবাল এডাপটেশন উইক আয়োজন করে। এই বছরের (২০২৩) আয়োজনটি যেমন জাতীয়, তেমনি আন্তর্জাতিকও, কারণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অংশগ্রহণকারীরা এতে যোগ দিচ্ছেন। 

এ বছরের আয়োজনের মূল বিষয় ছিল অভিযোজন কার্যক্রমকে দ্রুত বিস্তৃত করা এবং যত দ্রুত সম্ভব রূপান্তরমূলক অভিযোজনের পথে যাওয়া। এই আলোচনাগুলো সময়োপযোগী, কারণ আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বিলম্বের অর্থ আরও বড় ক্ষতি, আরও গভীর সংকট।

প্রথমেই আমাদের এডাপটেশন বা অভিযোজন-চেষ্টায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মানব-সৃষ্ট জনবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমরা প্রতিদিনই দেখি। প্রতিদিনই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও খরা, বন্যা, ভূমিধ্বস, টর্নেডো হচ্ছে। প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের নিজেদের অভিযোজনের গতিও বাড়াতে হবে, কারণ ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে এখনই দ্রুত, সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়ায় উপায় নেই।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতা যারা আছেন— তাদের অর্থায়নের ধরনও বদলাতে হবে। প্রোজেক্ট-ভিত্তিক এডাপটেশন অর্থায়নের চেয়ে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলদায়ক প্রোজেক্টগুলোয় অর্থায়ন জরুরি। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশে অভিযোজন-সংক্রান্ত অর্থায়নে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। অর্থায়নের এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যাবে।

আরেকটা পদ্ধতি এমন হতে পারে যে একইরকম পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির দেশগুলোকে একসাথে একটা আলাদা গ্রুপে ভাগ করা যাতে দেশগুলো অভিযোজন বা এডাপটেশন প্রসঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একেক দেশের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো একেকরকম, ফলে দেশগুলো তাদের নিজস্ব অভিযোজন প্রক্রিয়া একে অন্যের সাথে বিনিময় করার দরুণ যে জ্ঞানকোষ তৈরি হবে- তা ভবিষ্যতের জন্য হতে পারে এক অমূল্য সংযোজন। 

অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজটি (Capacity Building) আরও বিস্তৃতভাবে নিতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে সচেতনতা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ বাড়ানো দরকার। তরুণদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হবে না। এ অঞ্চলের এক দেশের শিক্ষার্থীদের অন্য দেশে পড়াশোনার সুযোগ ও বৃত্তি বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জলবায়ুবিষয়ক নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি ২০২৪ সাল থেকে এশিয়ার অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত।

পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই- অভিযোজনের এই চেষ্টাকে জাতীয় নেতৃত্বে আরো গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে মানব-সৃষ্ট দুর্যোগের প্রভাব মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন বড় বাজেট, শক্তিশালী নীতি এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই দিক থেকে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উদাহরণ হয়ে উঠছে, কারণ দেশটি জাতীয় বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ করে আসছে।

জলবায়ু বিপর্যয় রোধের লড়াই কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সমাজের সব স্তরের মানুষকে এ লড়াইয়ে যুক্ত হতে হবে। রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, তরুণ সমাজ ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। 

এখন প্রশ্ন একটাই, আমরা কি সময় থাকতে প্রস্তুতি নেব, নাকি আরও বড় বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকব?

মূল লেখা: অধ্যাপক ড. সালিমুল হক
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নীতিনির্ধারণী চিন্তাবিদ 

অনুবাদকের নোট
গত কয়েক দশক ধরেই পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ সংকটের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গটি সবার শীর্ষে। মানবসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের যে ঢেউ উঠেছে- তার প্রভাব সর্বত্র প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপারটি মানে হচ্ছে পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া ও তাপমাত্রার ধারা বা গড় বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন। এটি প্রাকৃতিক কারণে ঘটতে পারে, আবার মানুষের তৈরি করা কিছু কারণেও হতে পারে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে এই পর্যন্ত দেখা গেছে কার্বন নির্গমন, শিল্পায়ন, বন উজাড়সহ আরো কিছু। কিছুকিছুক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাবও প্রকট।

২০২৩ সালে প্রকাশিত এশিয়া টাইমসের একটি প্রবন্ধ ঘেঁটে কিছু গা শিউরে ওঠার মতো তথ্য জানা গেলো। সাধারণত পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত জলবায়ু পরিবর্তনের আর্টিকেলগুলো অত মনযোগ পায় না। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলোর আপডেটও জানা থাকা দরকার। 

২০২৩ সালের মে মাস ছিলো ভারতের জন্য সবচেয়ে উষ্ণ, নয়াদিল্লিতে তাপমাত্রার রেকর্ড করা হয়েছিলো ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস! মার্চ থেকে মে- এই তিন মাসের কিছু সময়ও ছিল অত্যন্ত শুষ্ক। এ সময়কালে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেই বৃষ্টিপাত কম হয়েছে যথাক্রমে ৭১ ও ৬২ শতাংশ। টানা দুই বছর খরায় পুড়েছে আফগানিস্তান, ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জেরে ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। 

লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় চরম মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের ৪ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ফলে- জলবায়ু এখন আর দূরের কোনো ‘চিন্তা’ নয়।  

Nature-এ অধ্যাপক সালিমুল হকের পরিচয় দেওয়ার সময় বলা হয়েছে: Climate Visionary. A relentless climate scientist who was the voice of the voiceless in the global climate fight.

বাংলাদেশে জলবায়ু চিন্তাকে একাডেমিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথিকৃত অধ্যাপক সালিমুল হক, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি করেছেন একটা সক্রিয় সামাজিক আন্দোলন। অনুবাদকৃত লেখাটি ২০২৩ সালে প্রকাশিত, কোরিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পরের অভিজ্ঞতার কিছু পরিজ্ঞান বা ইনসাইট।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম