Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

ঢাকার ট্রাফিকে ব্যাটারি অটোরিকশা: সমস্যা, পরিসংখ্যান ও সমাধান

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

ঢাকার ট্রাফিকে ব্যাটারি অটোরিকশা: সমস্যা, পরিসংখ্যান ও সমাধান

অটোরিকশা। ফাইল ছবি

ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র চাপে রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ রাজধানীতে চলাচল করে, অথচ রাস্তার পরিমাণ মোট আয়তনের মাত্র ৭–৮ শতাংশ। এই সীমিত অবকাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমানে ঢাকায় আনুমানিক ২ থেকে ৩ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে, যার বেশিরভাগই নিয়ন্ত্রণহীন ও নিবন্ধনবিহীন।

এই অটোরিকশাগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো যত্রতত্র পার্কিং। রাস্তার পাশে, মোড়ে, বাজারের সামনে—যেখানে একটু জায়গা পায় সেখানেই তারা দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যায় এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে তারা যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায়। কোনো নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড বা নিয়ম মানা হয় না। রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানো বা নামানোর কারণে পেছনের যানবাহন হঠাৎ ব্রেক করতে বাধ্য হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো গতি প্রতিযোগিতা। অনেক অটোরিকশা চালক মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত চলার চেষ্টা করে। এমনকি ঢাকার ভিআইপি রোডগুলোতেও তারা দ্রুতগতিতে চলাচল করে। ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলার ফলে বড় গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হলে তা ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।

ফিডার রোড এবং আবাসিক এলাকায় এই ঝুঁকি আরও বেশি। সরু রাস্তা, মানুষের ভিড় এবং শিশুদের উপস্থিতির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। প্রতিদিন আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০টি ছোট দুর্ঘটনা ঘটে, যার একটি বড় অংশে অটোরিকশা জড়িত। এসব দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হয়, ফলে এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে আসে না।

বিশেষ করে স্কুল এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনেক সময় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিশুদের ওপর উঠে যায়। পথচারী নারীরাও এর শিকার হন। প্রতি মাসে কয়েকশ শিশু ও নারী এ ধরনের দুর্ঘটনায় আহত হন বলে ধারণা করা হয়।

বিশেষ করে স্কুল এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনেক সময় অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিশুদের ওপর উঠে যায়। পথচারী নারীরাও এর শিকার হন। প্রতি মাসে কয়েকশ শিশু ও নারী এ ধরনের দুর্ঘটনায় আহত হন বলে ধারণা করা হয়। এসব ঘটনা অধিকাংশ সময় সংবাদমাধ্যমে আসে না, ফলে সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায় কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব গভীর।

এই সমস্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। সারা দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের ছোট-বড় বাজারগুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশে আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় চলাচল করে। একটি মাঝারি উপজেলা বাজারে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১৫০০ অটোরিকশা প্রবেশ করে, যার ফলে বাজারকেন্দ্রিক যানজট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং মানুষের সময় অপচয় হয়।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সেই হিসেবে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ১২০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ এই খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগ থেকে নেওয়া হয়, ফলে বিদ্যুৎ চুরি বাড়ছে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

একটি অটোরিকশা প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সেই হিসেবে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৯০ থেকে ১২০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ এই খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগ থেকে নেওয়া হয়, ফলে বিদ্যুৎ চুরি বাড়ছে এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

অটোরিকশার আকারও যানজটের একটি কারণ। এটি সাধারণ রিকশার তুলনায় বড় হওয়ায় সরু রাস্তায় চলাচল ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অটোরিকশার কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই, ফলে দুর্ঘটনা বা অপরাধের ক্ষেত্রে চালককে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চালকদের প্রশিক্ষণের অভাবও একটি বড় সমস্যা। প্রায় ৬০ শতাংশ চালক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাননি। তারা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ বা অসচেতন। ফলে নিয়ম ভঙ্গের প্রবণতা বেশি এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। 

প্রথমত, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে গাড়ির সংখ্যা, রুট, গতি এবং পার্কিং নিয়ম নির্ধারণ থাকবে। 

দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।

তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ছাড়া কোথাও পার্কিং নিষিদ্ধ করতে হবে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হবে। 

চতুর্থত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

পঞ্চমত, বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

ষষ্ঠত, ফিডার রোডে সীমিতভাবে অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দিতে হবে এবং ভিআইপি ও প্রধান সড়কে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। 

সপ্তমত, স্কুল ও জনবহুল এলাকায় গতি সীমা ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করতে হবে এবং স্পিড ব্রেকার স্থাপন করতে হবে।

অষ্টমত, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

নবমত, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং যাত্রীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মিডিয়াকে ছোট দুর্ঘটনাগুলোও তুলে ধরতে হবে, যাতে সমস্যা দৃশ্যমান হয়।

সবশেষে বলা যায়, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা একটি বাস্তবতা এবং এটি অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তবে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিসংখ্যানভিত্তিক নীতি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই খাতকে শৃঙ্খলায় আনা জরুরি। তাহলেই ঢাকা সহ সারা দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থা আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর হবে।

লেখক: ড. মো. রুহুল আমিন সরকার 

অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার সিআইডি, ঢাকা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম