Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

শিশুর হাতে বই দিতে হলে বড়দের হাতে কাজ দিতে হবে

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

শিশুর হাতে বই দিতে হলে বড়দের হাতে কাজ দিতে হবে

ফাইল ছবি

শিশুশ্রমের কথা উঠলেই আমরা প্রায়ই চোখের সামনে দেখি চায়ের দোকানের বালক, বাসের সহকারীর কিশোর মুখ, গ্যারেজের কালিমাখা হাত, হোটেলের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া কোনো শিশুর চোখ। আমরা বলি, শিশুকে কাজে পাঠানো অপরাধ। কথাটি সত্য, কিন্তু পুরো সত্য নয়। শিশুশ্রমকে শুধু শিশুকে কাজে পাঠানো হিসেবে দেখলে বাস্তবতার বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। কারণ যে শিশুটি আজ স্কুলের বেঞ্চে বসার বদলে কর্মস্থলে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে অনেক সময় থাকে একটি অসহায় পরিবার, অনিশ্চিত আয়, খাবারের চিন্তা, বাড়িভাড়ার চাপ, চিকিৎসার খরচ, ঋণের বোঝা এবং বেঁচে থাকার কঠিন হিসাব।

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আমাদের সেই অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। শিশুর কাজ করার কথা নয়; তার শেখার কথা, খেলার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা। কিন্তু দারিদ্র্য যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন অনেক পরিবারে শৈশবই প্রথম বন্ধক পড়ে। যে বয়সে শিশুর হাতে পেন্সিল থাকার কথা, সে বয়সে তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় কাপ-পিরিচ, হাতুড়ি, ঝুড়ি, ভারী বোঝা কিংবা কারখানার সরঞ্জাম। এই দৃশ্য শুধু মানবিক বেদনার নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতারও আয়না।

শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে আনা যত জরুরি, তার পরিবারকে নিরাপদ জীবিকার ভরসা দেওয়া ততটাই জরুরি। কারণ পেটের দায়কে শুধু আইন দিয়ে থামানো যায় না। আইন দরকার, কঠোর প্রয়োগও দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে দরকার পরিবারভিত্তিক সহায়তা, মানসম্মত শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সম্মানজনক কাজ। শিশুর হাতে বই তুলে দিতে হলে তার মা-বাবার হাতে কাজ দিতে হবে। শিশুর স্কুলে যাওয়া নিশ্চিত করতে হলে পরিবারের রান্নাঘরে চুলা জ্বলার নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

একটি শিশু কেন কাজে যায়, এই প্রশ্নের উত্তর সব সময় একরকম নয়। কারও বাবা অসুস্থ, কারও মা একা সংসার চালান, কারও পরিবার নদীভাঙন বা জলবায়ু সংকটে সব হারিয়েছে, কেউ শহরে এসে বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে, কেউ ঋণ শোধ করতে গিয়ে শিশুর আয়কেও পরিবারের আয়ের অংশ করে ফেলেছে। কোথাও শিক্ষা ব্যয়, কোথাও স্কুলের দূরত্ব, কোথাও পড়াশোনার মান নিয়ে হতাশা, কোথাও নিরাপত্তাহীনতা শিশুকে ধীরে ধীরে বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এরপর একদিন দেখা যায়, শিশুটি আর ছাত্র নয়, সে শ্রমিক।

এই শ্রম অনেক সময় চোখে পড়ে, অনেক সময় পড়ে না। দোকান, বাজার, গ্যারেজ, কারখানা, পরিবহণ, নির্মাণস্থল বা হোটেলে শিশুশ্রম দৃশ্যমান। কিন্তু ঘরের ভেতরে, গৃহকর্মে, পারিবারিক কাজে কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে বহু শিশুর শ্রম অদৃশ্য থেকে যায়। মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে এই অদৃশ্যতা আরও গভীর। তারা অনেক সময় ঘরের কাজ, ছোট ভাইবোন দেখাশোনা কিংবা গৃহকর্মে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে যে সমাজ সেটাকে শ্রম বলেই মনে করে না। অথচ এর ফলে তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়, স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং ভবিষ্যতের পথ সংকুচিত হয়ে আসে।

শিশুশ্রমের ক্ষতি তাৎক্ষণিকও, দীর্ঘমেয়াদিও। আজ যে শিশু পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যায়, সে হয়তো পরিবারের জন্য সামান্য আয় আনতে পারে, কিন্তু তার বিনিময়ে হারায় শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদার বড় অংশ। দীর্ঘদিনের শ্রম তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই ক্লান্ত করে দেয়। কম শিক্ষা ও কম দক্ষতার কারণে সে বড় হয়েও কম মজুরির কাজে আটকে যায়। ফলে দারিদ্র্যের যে চক্র তাকে শিশুশ্রমে ঠেলে দিয়েছিল, সেই চক্রই পরবর্তী প্রজন্মেও চলতে থাকে। তাই শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুর ক্ষতি নয়, এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের মানবসম্পদ এবং একটি দেশের উন্নয়ন-সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই সংকট মোকাবিলায় আবেগের পাশাপাশি দরকার বাস্তব পরিকল্পনা। প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি। যারা শিশুদের বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত করে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবারগুলোকে এমন সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে, যাতে শিশুর আয়ের ওপর পরিবার নির্ভরশীল না থাকে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয়কে আরও আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও কার্যকর করতে হবে। শুধু ভর্তি করালেই হবে না, শিশুকে স্কুলে ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে পুষ্টি, স্বাস্থ্য, মানসিক সহায়তা এবং দক্ষতা বিকাশের সুযোগ যুক্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। একটি শিশুকে কাজে দেখা গেলে শুধু তাকে সরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কেন সে কাজে এসেছে, তার পরিবার কোথায়, সে স্কুলে যায় কিনা, তার বাবা-মায়ের আয় আছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, স্কুল, শ্রম দপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় ব্যবসায়ী, নাগরিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুশ্রম প্রতিরোধ কোনো একক দপ্তরের কাজ নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত নৈতিক দায়িত্ব।

গণমাধ্যমেরও এখানে বড় ভূমিকা আছে। শিশুশ্রমের গল্পকে শুধু করুণ দৃশ্য হিসেবে তুলে ধরলে চলবে না। আমাদের দেখাতে হবে, কোন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা শিশুকে কাজে নামাচ্ছে। দেখাতে হবে, কোথায় আইন অকার্যকর, কোথায় স্কুল শিশুকে ধরে রাখতে পারছে না, কোথায় পরিবার সহায়তার বাইরে রয়ে যাচ্ছে, কোথায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সস্তা শ্রমের লোভে শিশুর অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। শিশুর পরিচয়, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করে তার জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথ।

শিশুশ্রম প্রতিরোধের লড়াই আসলে শৈশব রক্ষার লড়াই। এটি দয়ার বিষয় নয়, অধিকারের বিষয়। একটি শিশু দরিদ্র পরিবারে জন্মেছে বলে তার বই থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা নয়। একটি পরিবার বিপদে পড়েছে বলে শিশুর কাঁধে সংসারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির কাজ হলো বড়দের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া এবং শিশুকে শিক্ষার নিরাপদ পথে ফিরিয়ে আনা।

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে সবচেয়ে জরুরি প্রতিজ্ঞা হতে পারে, আমরা শিশুশ্রমকে কেবল দৃশ্যমান কর্মস্থলের সমস্যা হিসেবে দেখব না। আমরা দেখব সেই ঘরটিকেও, যেখানে খাবারের চিন্তায় শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা দেখব সেই মাকেও, যিনি সন্তানের বই কিনতে পারেন না। আমরা দেখব সেই বাবাকেও, যিনি কাজ না পেয়ে সন্তানের আয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কারণ শিশুশ্রমের শিকড় যত গভীরে, সমাধানও তত গভীর হতে হবে।

শিশুর হাতে কাজ নয়, বই মানায়। কিন্তু সেই বই শুধু স্লোগানে তুলে দেওয়া যায় না। তার জন্য দরকার ন্যায্য সমাজ, মানবিক অর্থনীতি, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সচেতন নাগরিক মন। যেদিন শিশুর পরিবার অনাহারের ভয় ছাড়াই বাঁচতে পারবে, যেদিন বড়রা সম্মানজনক কাজ ও ন্যায্য আয় পাবে, যেদিন স্কুল হবে শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রিয় জায়গা, সেদিনই শিশুশ্রম প্রতিরোধের লড়াই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যাবে। শৈশবকে বাঁচাতে হলে শিশুকে নয়; আগে বদলাতে হবে সেই বাস্তবতাকে, যা তাকে শ্রমিক বানিয়ে দেয়।

আনিসুর বুলবুল, লেখক ও সাংবাদিক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম